৬০ দিনের সমঝোতা শেষ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কঠিন পথ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে করা সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আজ সোমবার শেষ হচ্ছে। সমঝোতার আওতায় যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং পরবর্তী সময়ে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে সমঝোতা কার্যকর হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই দুই পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তোলে। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে সমঝোতা হবে, নাকি সংঘাত আরও তীব্র হবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এর আগে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সমঝোতাটি কেবল যুদ্ধবিরতির জন্য ছিল না; বরং এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের অবসান। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা লঙ্ঘন করে হামলা চালিয়ে যাওয়ায় সেটি নবায়নের কোনো কারণ নেই।
সমঝোতা স্মারককে চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ দেওয়ার জন্য দুই দেশের মধ্যে ৬০ দিনের আলোচনা চলার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এখন কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণের বিষয়ে ওমানের সঙ্গেও আলাদা একটি চুক্তি নিয়ে কাজ করছে ইরান। তবে রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া সেটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম।
হরমুজকে ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পরাস্ত করার পর হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি জানাবে ওয়াশিংটন। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখাও সহজ নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বার্বারা স্লাভিনের মতে, তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর মতো কার্যকর হাতিয়ার এখন ওয়াশিংটনের হাতে খুব বেশি নেই।
দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, কৌশলগত তেলের মজুত এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রভাব পড়ছে। ফলে সামরিকভাবে ইরানের ওপর আরও চাপ তৈরির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের বিকল্প সীমিত হয়ে আসতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও হরমুজ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, সরবরাহব্যবস্থা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। ইরান এরই মধ্যে দেখিয়েছে, প্রণালিটির ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তেহরানের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় সাম্প্রতিক পরিবর্তনও ভবিষ্যৎ অবস্থানের একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে আইআরজিসির সাবেক প্রধান মহসেন রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও বেসামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় তৈরির লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন।
তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম মনে করেন, এসব পরিবর্তন থেকে বোঝা যায়, ইরান মনে করছে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য সুবিধাজনক। ফলে নতুন করে আলোচনা শুরু হলে তেহরান আগের চেয়ে বেশি দাবি নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে পারে।
সম্ভাব্য দাবির মধ্যে থাকতে পারে গাজা যুদ্ধের অবসান, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইয়েমেনের ওপর অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ।
সমাধানের পথ কোথায়?
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ ইতোমধ্যে সমঝোতা থেকে পাওয়া সুবিধাগুলোকে ইরানের ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, সামরিক ও রাজনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই ইরান শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে নতুন যুদ্ধ শুরু হবে—এমন নয়। বরং এখন উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালি এই দর-কষাকষির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াশিংটন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইবে, আর তেহরান চাইবে যুদ্ধের ক্ষতি ও নিজেদের কৌশলগত অবস্থানের বিনিময়ে আরও বেশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে। ফলে সামনের দিনগুলোতে সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে চাপ, পাল্টা চাপ এবং পরোক্ষ আলোচনার পর্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চূড়ান্ত সমাধানের জন্য শেষ পর্যন্ত একটি নতুন রাজনৈতিক চুক্তির প্রয়োজন হবে। তবে সেটি দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আলোচনার গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো—সংঘাতের অবসান নয়, বরং নতুন করে দর-কষাকষি ও উত্তেজনার একটি দীর্ঘ পর্ব।
আ.দৈ/এসআর




















