রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিপর্যয়ের নেপথ্যে গণিত-ইংরেজি
দুই দশকের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার কম
নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৯ পিএম  আপডেট: ১০.০৮.২০২৬ ৫:১৫ পিএম  (ভিজিট : ৫২)
X

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে। চলতি বছরের পরীক্ষায় গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নিয়েও ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালের পর এবারই এসএসসিতে পাসের হার সবচেয়ে কম। ওই বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর গত ১৯ বছরে কোনো বছরই পাসের হার এত নিচে নামেনি।

কেন  ফল খারাপ  ?

ফলাফল বিশ্লেষণ করে শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, এবার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ দুটি বিষয়ে তুলনামূলক বেশি ফেল করেছে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও ফল খারাপ হয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, মানবিক বিভাগে এবার বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার কারণে এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফেল করার হার বেড়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিবছরই এ দুটি বিষয়ে বেশি ফেল দেখা যায়। তবে এবার এত বেশি শিক্ষার্থী কেন ব্যর্থ হলো, তা মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করে বের করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, শুধু প্রশ্ন কঠিন হওয়া কিংবা খাতা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করাকে ফল খারাপের কারণ হিসেবে দেখলে চলবে না। বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শেখানোর ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তার মতে, কারিকুলাম যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না হওয়া এবং শিক্ষকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিও শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে।

মোবাইল ফোনেও পড়াশোনায় ব্যাঘাত:

শিক্ষকদের কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমে যাওয়াকেও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের শিক্ষক আশরাফ উদ্দীন বলেন, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা সাধারণত গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল থাকে। এবার এ দুটি বিষয়ে তাদের ফল আরও খারাপ হয়েছে।

তিনি বলেন, পড়াশোনার বাইরে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন কাজে বেশি সময় দিচ্ছে। ফলে তুলনামূলক কঠিন বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত মনোযোগ ও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে না।

বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটও বড় কারণ:

অভিভাবকদের কেউ কেউ বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক সংকট ও পাঠদানের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

রাজধানীর মতিঝিল বালক উচ্চবিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মারুফ বিল্লাহ বলেন, তার ছেলে জিপিএ-৪ পেয়েছে। গণিত, ইংরেজি ও অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত নম্বর না পাওয়ায় জিপিএ-৫ হয়নি।

তার অভিযোগ, বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম। বিশেষ করে গণিতের ভালো শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসের পড়ায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে অনেককে বাসায় কিংবা কোচিংয়ে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।


১১ বোর্ডে চিত্র:

এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন।

জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন এবং ছাত্র ৫২ হাজার ৭৮০ জন।

এবারও ফলাফলে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে। ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। বিপরীতে ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার ঢাকা বোর্ডে—৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে ৬৩ দশমিক ৬৭, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২, যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮, বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক ০৫ এবং ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।

দুই দশকের ফলাফলে বড় পতন:

২০০১ সালে এসএসসিতে জিপিএ পদ্ধতি চালুর পর প্রথম কয়েক বছর পাসের হার তুলনামূলক কম ছিল। ২০০৬ সালে পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২২ শতাংশ। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে।

এরপর ধারাবাহিকভাবে পাসের হার বাড়তে থাকে। ২০০৮ সালে ৭২ দশমিক ১৮ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পাস করে।

২০১৪ সালে পাসের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশে। ২০১৭ সালে তা ছিল ৮০ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০১৮ সালে কমে ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ হলেও পরের দুই বছর আবার ৮০ শতাংশের ওপরে ছিল।

করোনাকালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও সীমিত বিষয়ে পরীক্ষা হওয়ায় ২০২১ সালে পাসের হার বেড়ে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৮৭ দশমিক ৪৪, ৮০ দশমিক ৩৯ ও ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।

২০২৫ সালে পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার পর পাসের হার নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। এবার আরও কমে তা দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে।

‘ফল খারাপ নয়, সুন্দর হয়েছে’:

তবে ফল প্রকাশের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফলাফলকে বিপর্যয় হিসেবে মানতে চাননি।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা খাতায় যা লিখেছে, তার ভিত্তিতেই নম্বর পেয়েছে। কারও ফল নিয়ে সন্দেহ বা আপত্তি থাকলে খাতা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে।

কারণ অনুসন্ধানের আশ্বাস

প্রতিবছর কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করলেও কেন এমন হচ্ছে, তা নিয়ে স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এবার গণিত ও ইংরেজিতে যারা খারাপ করেছে, তাদের দুর্বলতার কারণ খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের কীভাবে এ দুটি বিষয়ে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু ফল প্রকাশের পর কারণ অনুসন্ধানের আশ্বাস দিলেই হবে না। বিদ্যালয় পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের ভিত্তি শক্ত করা, গণিত ও ইংরেজিতে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করা, শিক্ষক সংকট দূর করা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে প্রতি বছরই ফল প্রকাশের পর নতুন করে ‘বিপর্যয়ের’ কারণ খোঁজার চক্র চলতে থাকবে।

আ. দৈ./কাশেম


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝