কাতার ট্রিবিউনের রিপোর্ট
তীব্র তাপমাত্রায় বাড়তি খরচের চাপে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিবছরই তাপমাত্রা বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জীবনে। তীব্র গরমে স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি নিজেদের সুস্থ রাখতে অতিরিক্ত খরচের বোঝাও বহন করতে হচ্ছে তাদের। সীমিত আয়ের বড় একটি অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে খাবার স্যালাইন, ডাব, লেবুর শরবত, ঠান্ডা পানীয় ও প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে।
গাজীপুরের কোনাবাড়ীর একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত নাসরিন বেগমের মতো অনেক শ্রমিকই মাসে প্রায় এক হাজার টাকার বেশি শুধু গরমের সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য ব্যয় করছেন। ১৪ হাজার টাকা মূল বেতনের একজন শ্রমিকের জন্য এই অতিরিক্ত খরচ সংসার চালানোকে আরও কঠিন করে তুলছে। কাজ চালিয়ে যেতে এবং অসুস্থতা এড়াতে তাদের এই ব্যয় করতেই হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। পাশাপাশি উচ্চ আর্দ্রতার কারণে মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রাও আরও কয়েক ডিগ্রি বেশি হয়ে উঠছে। অথচ শিল্পকারখানা ও বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনও কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা কার্যকর হয়নি। শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিপলস কারেজ ইন্টারন্যাশনাল এই অতিরিক্ত ব্যয়কে ‘হিট ট্যাক্স’ বা তাপজনিত অদৃশ্য কর হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কারখানার ভেতরে ফ্যান ও এক্সহস্ট ফ্যান চালু থাকলেও তাপমাত্রা প্রায়ই ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকে। ফলে শ্রমিকদের বারবার পানি দিয়ে মুখ-হাত ধুতে হয় এবং প্রচুর পানি পান করতে হয়। কর্মঘণ্টা শেষে বাসায় ফিরেও স্বস্তি মেলে না। গাজীপুরসহ শিল্পাঞ্চলে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও গরম ঘরের কারণে রাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়ায় শ্রমিকদের শারীরিক ক্লান্তি আরও বাড়ছে।
এদিকে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিক ও অন্তঃসত্ত্বা মায়েরা তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। অসুস্থ হয়ে কাজে অনুপস্থিত থাকলে কিংবা অর্ধদিবস ছুটি নিলে বেতন কেটে নেওয়া হয়। তাই প্রতিদিন গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে শ্রমিকরা আখের রস, ঠান্ডা পানীয়, ওরস্যালাইন ও বিভিন্ন ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় স্যালাইন নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় এসব ব্যয়ও তাদের নিজেদের বহন করতে হচ্ছে।
শুধু শ্রমিক নয়, কারখানা মালিকদের ওপরও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে। শ্রমিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যালাইন, অতিরিক্ত বায়ু চলাচল এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জেনারেটরের জ্বালানি খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পোশাক শিল্পের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমিকদের সুরক্ষায় শিল্পকারখানায় উন্নত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই শ্রমিকরাই, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্যও তাদেরই দিতে হচ্ছে।
আ.দৈ/আরএস




















