ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের প্রাথমিক শিক্ষা লাঠে উঠার উপক্রম
আশিকুর রহমান মিঠু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

অলরেডি আমার ঘাড়ের দুটি রগ ব্লক খেয়ে রয়েছে। যেকোন মুহুর্তে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। আরো কিছু সমস্যা আছে আমার ডায়াবেটিস, হাইপ্রেসার আছে। লিভারের সমস্যা আছে। স্বাসকষ্ট রোগে ভোগতেছি। এমন পরিস্থিতি যদি আর কিছুদিন চলে মনে হয়না আমি আর অফিস করতে পারবো’।
এই বক্তব্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হিসাব সহকারী মো. আবু হানিফের। অতিরিক্ত কাজের চাপে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তার জীবন। এখানে থাকার কথা ১১জন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। সেখানে আছেন মাত্র ১জন। হাঁপিয়ে উঠেছেন এই কর্মকর্তাও। একজন হিসাব সহকারী ছাড়া অফিসে করণিক পদে আর কেউ নেই। এমনকি পিয়নও নেই। লোকবলের বর্তমান এই অবস্থাতে বলতে গেলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ভবনটিই দাড়িয়ে আছে শুধু।
শিক্ষা কর্মকর্তা বা অফিস ষ্টাফের অভাবই নয়, বিদ্যালয়গুলোতেও প্রকট শিক্ষক সংকট। ২১৯ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আছেন মাত্র ৬৯জন। প্রধান শিক্ষকের দেড়শো পদই শূন্য।ফলে জেলার বৃহৎ এই উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা লাঠে উঠার উপক্রম হয়েছে।
উপজেলা কমপ্লেক্সের প্রবেশ মুখে তিন তলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসটি দেখলে পরিত্যক্ত একটি ভবন বলেই মনে হয়। মানুষের আনাগোনা নেই। দুটি কক্ষ ছাড়া বাকী সব কক্ষই তালাবদ্ধ।শিক্ষকরা এসে ফাইলপত্র নিয়ে নিজেদের কাজ নিজেরাই করছেন। টেবিলে ফাইলের স্তুপ। জনবল কাঠামো অনুসারে একজন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছাড়াও এখানে থাকার কথা ১১ জন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার ১০টি পদই শূন্য।
ফলে ২১৯ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৪শ শিক্ষক আর প্রায় ৫৫হাজার শিক্ষার্থীকে দেখার কেউ নেই এখানে। দাপ্তরিক কাজকর্ম করার কোন লোকও নেই। উচ্চমান সহকারীর একমাত্র পদটি শূন্য। অফিস সহকারী কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের ৩টি পদই ফাকা। অফিস সহায়কের ১ জনের পদও শূন্য। গত কয়েক মাস ধরে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদশূন্য থাকলেও অফিসের করণিকপদগুলো শূন্য ২ বছর ধরে। সব মিলিয়ে বেহাল এই উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা। অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অফিসের হিসাব সহকারী আবু হানিফ।
নানা রোগে কাবু অফিসের এই কর্মচারী শারিরীক ভাবে যেকোন সময় দূর্ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, ২০১২ সালে এখানে যোগদান করার সময় ৪ জন ছিলাম আমরা। তখন শিক্ষক সংখ্যা কম ছিলো। ৫/৬শ শিক্ষক ছিলো। আইটি ব্যাজ এতো কাজ ছিলোনা। ৪ জনে সুন্দর-সুচারুভাবে অফিস পরিচালনা করতে পেরেছি। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ৩ জন অবসরে চলে যাওয়ার পর আমরা আরো ২জন ছিলাম।
২০২৪ সাল পর্যন্ত দু’জনে অফিস চালিয়েছি। অফিস প্রধান ইউডি কাম একাউন্ট্যান্ট বদলী হয়ে চলে যান কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। এরপর থেকে ২ বছর ধরে আমি একা আছি। এখান ২১৯টি স্কুল। প্রায় ১৪শ শিক্ষক। ১শ জন দফতরী। দেড় হাজার জনবলের প্রশাসনিক-আর্থিক যাবতীয় কাজ আমাকে একা সামলাতে হচ্ছে। যেকারনে আমার স্বাস্থ্যের ওপর অনেক প্রেসার পড়তেছে, ব্রেনের ওপর ওপর প্রেসার পড়তেছে। অলরেডি আমার ঘাড়ের দুটি রগ ব্লক খেয়ে রয়েছে।
যেকোন মুহুর্তে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। আরো কিছু সমস্যা আছে আমার ড্য়াাবেটিস, হাইপ্রেসার আছে। লিভারের সমস্যা আছে। স্বাসকষ্ট রোগে ভোগতেছি। এমন পরিস্থিতি যদি আর কিছুদিন চলে মনে হয়না আমি আর অফিস করতে পারবো। শিক্ষকদের প্রশাসনিক,আর্থিক এবং দৈনন্দিন অন্যান্য কাজ রয়েছে। এখানে প্রচুর কাজ। যে কাজগুলো আসলে সমাধা করা এই অসুস্থ শরীর নিয়ে আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব না। ৪টা পদ পূরণ না হলে শিক্ষার মান কিছুতেই সম্ভব নয়।
আতিয়ারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক বলেন-উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনেক সমস্যা। ১১ জন সহকারী শিক্ষা অফিসারের প্রয়োজন। ওই জায়গায় একজন সহকারী শিক্ষা অফিসার দিয়ে গোটা নবীনগরের কার্য্যক্রম চলছে। অফিসের কার্যক্রমের মধ্যে অনেক সমস্যা। যেখানে ৬/৭ জন দরকার। সেখানে ১জনের পক্ষে খুবই কষ্টকর। ২১ ইউনিয়নে বিদ্যালয় পরিদর্শন একজনের পক্ষে কাভার করা খুউবই কষ্টকর।
বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোকজন এনে অফিসিয়াল কাজ করতে হয়। আমরা শিক্ষকরা অফিসিয়াল কাজের জন্য অনেক দুর্ভোগ ভোগ করছি। যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। নবীনগরে এমন কোন নজির ছিলোনা অফিসিয়াল কাজে এসে ঘন্টা ২ ঘন্টা,৫ঘন্টা,৭ ঘন্টা বসে থাকা বা কাজ হবেনা, আরেকদিন আসতে হবে। এরকম কোন নজির ছিলোনা। আমি ৩৮ বছর যাবৎ শিক্ষকতা করে আসছি। আমার জানামতে এমন দুর্ভোগ শিক্ষা অফিসে কোন সময় পায়নি।
গোসাইপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ তাসলিমা জাহান জানান, আমাদের অফিসে ষ্টাফের সমস্যা দীর্ঘ দিন যাবৎ। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য। প্রশাসনিক কাজ করতে ঝামেলা পোহাতে হয়। সঠিকভাবে করা যায়না। স্যার ভিজিটে থাকে। অফিসে অপেক্ষা করতে হয়। অভাব-অভিযোগ ঠিকমতো উপস্থাপনও করতে পারেনি।
শ্যামগ্রাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডালিয়া সুলতানা বলেন-সহকারী শিক্ষা অফিসার ১১ জনের জায়গায় ১জন আছেন,সমস্যাতো হবেই। অফিসে আগে ৫/৭জন ক্লার্ক ছিলো। দাপ্তরিক কাজে সমস্যা হয় আমাদের।
আশ্রাফপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরজুদা বেগম বলেন,আমাদের উপজেলা ২১ ইউনিয়ন নিয়ে। এটিইও(উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার) দরকার ১১জন। আমাদের ৮টা সাব ক্লাষ্টার। নূন্যতমতো ৮টা সাব ক্লাষ্টারের জন ৮জন এটিইও দরকার। আছে মাত্র ১জন। প্রাতিষ্ঠানিক বলেন,পড়ালেখা বলেন অনেক অসুবিধা। শারিরীক অসুস্থতায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রয়েছেন ছুটিতে।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মানিক ভূইয়া একাই সামলাচ্ছেন সব। তিনি জানান-৭ মাস ধরে সহকারী শিক্ষা অফিসার হিসেবে একাই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অফিস ষ্টাফের পদও শূন্য। এতে কাজে অনেক সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া ২১৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫০ বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক। সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে দেড়শোর মতো। এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার এই দূরাবস্থার বিষয়টি সম্প্রতি সংসদ সদস্য এডভোকেট আবদুল মান্নান সংসদে তুলে ধরেছেন।
আ. দৈ./কাশেম/ জাকির




















