রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শুক্রবার জেনেভায় চুক্তি স্বাক্ষর
যুদ্ধ অবসানে সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ৬:৪৮ পিএম   (ভিজিট : ৫০)
X

১০৭ দিনের সংঘাতের ইতি টানতে সমঝোতা; হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, সামরিক অভিযান বন্ধ, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে শুরু হবে নতুন আলোচনা

দীর্ঘ ১০৭ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্র অনিশ্চয়তার পর অবশেষে যুদ্ধ বন্ধে ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় দেশ একটি প্রাথমিক শান্তি কাঠামোতে (ফ্রেমওয়ার্ক) সম্মত হয়েছে, যার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। 

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে সব ফ্রন্টে, পুনরায় চালু হবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি এবং বন্ধ হবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধ। তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এখনও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি; এ নিয়ে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পৃথক আলোচনা চলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে চুক্তিতে পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করেছেন ট্রুথ সোশ্যালে। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি টোল ফ্রি হবে, আর সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজের ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টিভিতে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার খবর নিশ্চিত করেছেন। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা একে ইরানের বিজয় হিসেবে চিত্রিত করছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইতালি এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে।

রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দেন, “ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।” এর কিছুক্ষণ আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ জানান, উভয় পক্ষ যুদ্ধ অবসানে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তি শুধু যুদ্ধবিরতির ঘোষণা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সমঝোতাগুলোর একটি। কারণ যুদ্ধের কারণে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, পুরো অঞ্চলই ব্যাপক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়েছিল। তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়।

চুক্তির প্রধান শর্তগুলো কী
আধা-সরকারি ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির এক রিপোর্টে খসড়ার যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো: লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার।  ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। ইরান থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহার। ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি চালু করা। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা প্রদান। 

ইরানের তেল ও জ্বালানি পণ্যের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন না করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত। এই অঞ্চলে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বৃদ্ধি না করা এবং নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার মার্কিন প্রতিশ্রুতি।
মেহের নিউজ এজেন্সি আরও জানিয়েছে: “ইরানের জব্দকৃত বা স্থগিত তহবিলের অন্তত অর্ধেক মুক্ত করা, ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে না। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, চূড়ান্ত চুক্তিটি পরবর্তীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।

পরমাণু ইস্যু: সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা
এদিকে যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা হলেও সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। অন্যদিকে তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। চুক্তির বর্তমান কাঠামোয় পরমাণু ইস্যু চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বরং যুদ্ধবিরতি কার্যকর রেখে আগামী দুই মাস আলোচনার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। এ কারণে অনেক বিশ্লেষক এই সমঝোতাকে “শান্তির ভিত্তি”, কিন্তু “চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি” নয় বলে উল্লেখ করছেন।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ সম্ভবত হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহন করা হয়। যুদ্ধের সময় নৌচলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। চুক্তির খবর প্রকাশের পরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালি পুরোপুরি চালু হলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও শিপিং খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো এর সুফল পেতে পারে।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। যুদ্ধের সময় লেবানন, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। এখন যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকে, তাহলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে সব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। বিশেষ করে লেবানন প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও অন্যান্য পক্ষের অবস্থানে কিছু পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এছাড়া ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের পথ পুরোপুরি মসৃণ হবে, এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া
চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানাতে শুরু করেছেন বিভিন্ন দেশের নেতারা। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, এই সমঝোতা আঞ্চলিক শান্তি ও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশা করেন। ইউরোপীয় দেশগুলোও কূটনৈতিক সমাধানের এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে।

সামনে কী?
এখন নজর শুক্রবারের জেনেভা বৈঠকের দিকে। সেখানে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর শুরু হবে পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইউরেনিয়াম মজুত এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে কঠিন দরকষাকষি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা সফল হলে তা শুধু একটি যুদ্ধের অবসান ঘটাবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তি স্থাপন করবে। তবে চুক্তির টেকসই সাফল্য নির্ভর করবে পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার ওপর। কারণ যুদ্ধ থামানো যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন হচ্ছে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। পরে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এক পর্যায়ে বিশ্বের তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ তৈরি করে। ওদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, জেনেভায় চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত থাকবেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্বাক্ষর করতে পারেন।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝