রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন আশা
যুদ্ধ বন্ধ চুক্তির দ্বারপ্রান্তে ওয়াশিংটন-তেহরান
হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত, নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও পারমাণবিক সংলাপসহ বহুমাত্রিক সমঝোতার অপেক্ষা;
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৮:০১ পিএম  আপডেট: ১৩.০৬.২০২৬ ৮:২৪ পিএম  (ভিজিট : ৭৩)
X

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, পারস্পরিক হামলা-পাল্টা হামলা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়া অনিশ্চয়তার পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার পথে এগোচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, কয়েক দফা গোপন ও প্রকাশ্য আলোচনার পর এমন একটি চুক্তির কাঠামো প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার আওতায় শুধু সামরিক সংঘাত বন্ধই নয়, বরং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডরগুলোর একটি হরমুজ প্রণালী পুনরায় নির্বিঘ্নভাবে উন্মুক্ত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 সবকিছু ঠিক থাকলে  রোববার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এতে সই করতে পারে তেহরান ও ওয়াশিংটন। পশ্চিমা একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, সমঝোতা স্মারকে এখনো পরিবর্তন আসা সম্ভব। তবে সম্ভাব্য চুক্তিতে এটা স্পষ্ট যে এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাঁর দেশ আরও শক্তিশালী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী,’ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন আব্বাস আরাগচি।

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফও। পাকিস্তান বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে এবং তাদের দাবি, চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ার ভাষা নিয়ে ইতোমধ্যে সমঝোতা হয়েছে।

আল জাজিরা জানিয়েছে প্রস্তাবিত চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করা। এর ফলে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস পরিবহন স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।

চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পৃথক ও বিস্তারিত আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ বা ধ্বংস করা হোক, অন্যদিকে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতার কিছু অংশ ধরে রাখতে আগ্রহী। ফলে এই ইস্যুটি এখনও সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। তবে শান্তিচুক্তির অগ্রগতি সত্ত্বেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। হরমুজ প্রণালীর কাছে নতুন সামরিক ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন বাহিনী দাবি করেছে, তারা বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে পাঠানো কয়েকটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলি হামলাও অব্যাহত রয়েছে।

চুক্তি নিয়ে বিভ্রান্তিও রয়েছে। পাকিস্তান বলছে চূড়ান্ত পাঠে সম্মতি হয়েছে, কিন্তু ইরানের কিছু সূত্র এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। উভয় পক্ষই অগ্রগতির কথা স্বীকার করলেও চুক্তি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই চুক্তি বাস্তবে স্বাক্ষরিত হয়, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অবসানই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও একটি বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতা এখনও পুরো প্রক্রিয়ার ওপর অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলছে।

তারা বলছেন সম্ভাব্য এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, সমঝোতার মূল ভিত্তি হবে যুদ্ধবিরতি, পারস্পরিক সংযম এবং আস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে চলমান বৈরিতা ও অবিশ্বাসের মধ্যে এই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো হরমুজ প্রণালীকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখার অঙ্গীকার। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এখানে যেকোনো অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। চুক্তির আওতায় ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করার নিশ্চয়তা দিতে পারে। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক উপস্থিতি ও টহল কার্যক্রম নিয়ে নতুন সমন্বয় কাঠামোতে যেতে পারে। এতে করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্তই হতে পারে পুরো চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। কারণ এটি সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।
সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে উভয় পক্ষের সামরিক অভিযান স্থগিত করা। সম্ভাব্য চুক্তি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রত্যক্ষ হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ বন্ধ রাখা হবে। 

একই সঙ্গে আঞ্চলিক মিত্র ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোকেও উত্তেজনা না বাড়ানোর বিষয়ে উৎসাহিত করা হতে পারে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অংশটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের কেন্দ্রীয় বিরোধের বিষয়। সম্ভাব্য চুক্তিতে এই ইস্যুতে নতুন করে আলোচনা শুরুর রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

জানা গেছে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা, পারমাণবিক কার্যক্রমে অধিক স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ সমঝোতার ভিত্তি তৈরির বিষয়ে দুই পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অধ্যায়ই হবে সবচেয়ে কঠিন। কারণ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উভয় পক্ষের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে বিপরীতমুখী।

ইরানের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। সম্ভাব্য সমঝোতার আওতায় কিছু অর্থনৈতিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে শিথিল করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং লেনদেন, মানবিক পণ্য আমদানি, ওষুধ, খাদ্য এবং জ্বালানি খাতে সীমিত ছাড় দেওয়ার বিষয় আলোচনায় থাকতে পারে। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির তেল রপ্তানির সুযোগও বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরানি তেলের সরবরাহ বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে।

চুক্তির অংশ হিসেবে বিদেশে আটকে থাকা বা জব্দকৃত ইরানি সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে।এ ধরনের পদক্ষেপকে আস্থা তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথও উন্মুক্ত হতে পারে। সম্ভাব্য চুক্তিতে মানবিক বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন অভিযোগে আটক মার্কিন ও ইরানি নাগরিকদের মুক্তি এবং বন্দি বিনিময়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও মানবিক উদ্যোগ দুই দেশের জনগণের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।

চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপ। ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া এবং লেবাননকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে, তা কমানোর জন্য পৃথক আলোচনার ব্যবস্থা করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি সংঘাতে না জড়ালেও তাদের প্রভাববলয়ের বিভিন্ন পক্ষ প্রায়ই মুখোমুখি অবস্থানে থাকে। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে আলাদা কাঠামো প্রয়োজন। চুক্তির খবর প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত হলে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমবে। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলো—বিশেষ করে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো এই পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

যদিও সম্ভাব্য এই সমঝোতা বিশ্বজুড়ে আশাবাদ তৈরি করেছে, তবুও বিশ্লেষকরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, চুক্তি স্বাক্ষরের চেয়ে সেটি বাস্তবায়ন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলেও রাজনৈতিক পরিবর্তন, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সেগুলোর অনেকই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমাধানের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাতময় বাস্তবতায় যদি এই চুক্তি কার্যকর হয়, তবে তা শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই নয়, গোটা অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। আর হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিও পেতে পারে বহুল প্রতীক্ষিত স্বস্তির বার্তা।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝