রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার রায়ের পর্যবেক্ষণ
সভ্য দেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মৌলিক দায়িত্ব : বিচারক
নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ৪:৪৫ পিএম   (ভিজিট : ৬৫)
X

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার রায়ে বিচারিক আদালত কিছু পর্ব্ক্ষেণসহ আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে ফ্যাঁসির রায় ঘোষণা করেছেন।

 মামলার রায়ে অপরাধের নৃশংসতা বিবেচনা করে দুই আসামিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় সর্বোচ্চ সাজা ফ্যাঁসি এবং প্রধান আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা ও স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই অর্থদণ্ড ভিকটিম রামিসার আইনগত উত্তরাধিকার পাবে।

আজ রোববার (৭ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এ রায় ঘোষণা করে।  ক্ষতিপূরণ না দিলে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ভিকটিম মৃত রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।

পর্যবেক্ষণে তিনি আরও বলেছে, যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

আদালত আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে এক হাজার আটশ (১৮০০+) বিচারাধীন মামলা রয়েছে, যার প্রতিটি মামলাই শিশুদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন অথবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা, একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের জন্য প্রতীক্ষারত অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশা। সেই প্রেক্ষাপটে শিশু রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে, তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে, বিজ্ঞ প্রসিকিউশন মামলার সব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সম্মুখে উপস্থাপন করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন এবং বিচারকার্যে সংশ্লিষ্ট সবার এই আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব প্রশংসার দাবিদার। আদালত এটাও প্রত্যাশা করে যে, শিশু রামিসার মামলার ন্যায় দ্রুত, দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা সংক্রান্ত অন্যান্য মামলাতেও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচারপ্রার্থী জনগণ এবং বিশেষত ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার যেন অযথা দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ একই রকম নিষ্ঠা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন এটাই এই আদালতের প্রত্যাশা।

একটি ন্যায়সঙ্গত বিচার কেবল আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; বরং তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, ডিফেন্স, সাক্ষীগণ এবং বিচার ব্যবস্থার সকল অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ন্যায়বিচারের লক্ষ্য অর্জিত হয়। আদালতের দায়িত্ব আবেগ দ্বারা নয়, বরং আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের চিরন্তন নীতিমালার আলোকে সত্য উদঘাটন করা। অতএব, এই আদালত অত্যন্ত সতর্কতা, সংবেদনশীলতা ও বিচারিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং মামলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ রায় প্রদান করছে।

এর আগে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে আনা হয়। এরপর ৮টা ৫০ মিনিটে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে আনা হয় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে। এসময় তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। রায় ঘোষণার আগে দুজনকেই এজলাসে তোলা হয়। বেলা ১১টার পর রায় পড়া শুরু করেন বিচারক।

এদিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও তৎপর থাকতে দেখা গেছে।

গত ১৯ মে সকালে পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করেন ভিকটিমের বাবা। মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে ভিকটিমকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো ও লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। এরপর তদন্তে মাঠে নামে পুলিশ। ঘটনার ৫ দিনের মাথায় ২৪ মে তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেন। চার্জশিটে মোট ১৭ জনকে সাক্ষী করা হয়।

এর আগে, গত ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য আজ দিন ধার্য করেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে নৃশংস এ ঘটনার মাত্র ১৯ দিন পর বিচার শেষ শেষ করেন ট্রাইব্যুনাল। গত ১ জুন সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ২ জুন শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। ওই দিন ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরার মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেন আদালত। পরে ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন আসামিরা।

মামলার এজাহার অভিযোগ করা হয়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা। এ সময় তাকে কৌশলে নিজেদের বাসায় ডেকে নেন স্বপ্না। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। 

একপর্যায়ে সোহেলের দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান তিনি।ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে সোহেলের শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বড় বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পান। পরে জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে।

আ. দৈ./কাশেম


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝