রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রত্যাশা ভিকটিমের পরিবারের
পল্লবীতে রামিসা হত্যা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ, কাল যুক্তিতর্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ৩:১৮ পিএম   (ভিজিট : ৩৫)
X

রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার প্রত্যাশা ভিকটমের পরিবারের এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের।

আজ বুধবার (৩ জুন) শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেছেন। একই সাথে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেছেন।
আজ শুনানির শুরুতে বিচারক মামলার ১৬ জন সাক্ষীর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য আসামিদের সামনে উপস্থাপন করেন। এতে রামিসাকে খোঁজার ঘটনা, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট শনাক্ত করা, ঘরের ভেতরে রক্তের আলামত ও শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের বিষয় উঠে আসে। পাশাপাশি অভিযোগ অনুযায়ী, স্বপ্না আক্তার কীভাবে সোহেলকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন, সে বিষয়ও উল্লেখ করা হয়।

আজ বুধবার সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও সকাল ১০টা ৫৭ মিনিটে তার স্ত্রী ও মামলার আরেক আসামি স্বপ্না আক্তারকে আদালতের এজলাসে আনা হয়। আজ বেলা ১১টা ১০ মিনিটে বিচারক মাসরুর সালেকীনের এজলাসে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি হয়।শুনানির আগে দুই আসামিকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়েছিল।

দেখা যায়, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল রানাকে তার স্ত্রী ও সহ-আসামি স্বপ্না আক্তারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তবে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা এতে বাধা দেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বপ্না আক্তারকে একটি টুলে বসার সুযোগ দেওয়া হয়। বিচারক এজলাসে আসার আগ পর্যন্ত সোহেলকে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায়।এভাবেই শুরু হয় রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন ও সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণের শুনানি।

শুনানিতে বিচারক মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অভিযোগের বিভিন্ন দিক আসামিদের সামনে তুলে ধরেন। এ সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ‘ডলার’ নামে একজনকে গ্রেফতারের দাবি তোলেন। অপর আসামি স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। শুনানি শেষে আদালত আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেন।

এদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে বলে তারা প্রত্যাশা করছে। আদালত আসামিদের কাছে সাক্ষীদের বক্তব্য, ভিডিও প্রমাণ এবং মামলার বিভিন্ন আলামত সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা আছে কি না, তা জানতে চান।

 আসামি আদালতকে বলেন‘আমি নির্দোষ স্যার, আমাকে মাফ করে দিন’ আমার একটা ছাওয়াল (সন্তান) আছে, স্যার। মাফ করে দেন।’আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যে সোহেল রানা বলেন, ‘আমি নির্দোষ স্যার। আমার একটা ছাওয়াল (সন্তান) আছে, স্যার।, আমাকে মাফ করে দিন।’ একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ডলারকে ধরেন। আমি অপরাধ করেছি। তাকেও ধরেন। অন্যদিকে সহ-আসামি স্বপ্না আক্তার আদালতে বলেন, ‘আমি কিছু করিনি।’

শুনানির পুরো সময় সোহেল রানাকে বিচারকের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় তার গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং মাথায় হেলমেট ছিল। তবে স্বপ্না আক্তারের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট খুলে রাখা হয়।

শুনানির সময় আদালত স্বপ্না আক্তারের উদ্দেশ্যে বলেন, সাক্ষীরা গতকাল যা বলেছেন তা বিস্তারিতভাবে শোনানো হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো ব্যাখ্যা আছে কি না।

আদালত বিশেষভাবে জানতে চান, দরজা খুলতে কেন দেরি করা হয়েছিল এবং স্বামীর অপরাধে সহায়তার অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য কী। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ঘটনাটি দেখার পরও দরজা খুলতে দেরি করেন এবং গ্রিল কেটে সোহেলকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন।
এ সময় আদালত উল্লেখ করেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সহায়তাকারী হিসেবেও একই ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন।
এর আগে মঙ্গলবার (২ জুন) মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। সেদিন তদন্তকালে জব্দ করা কাটা গ্রিলসহ বিভিন্ন আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয় এবং সাক্ষীদের মাধ্যমে সেগুলো শনাক্ত করে নথিভুক্ত করা হয়।

মামলায় মোট ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা। শিশু সাক্ষী হওয়ায় রাইসা আক্তারের সাক্ষ্য ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়।

শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, শুরুতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও পরবর্তীতে সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এ বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন জানিয়েছে।

তিনি বলেন, সোহেলের মুখে উচ্চারিত ‘ডলার’ নামটি তার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ছিল না। ফলে তদন্ত পর্যায়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও ছিল না।

দুলুর ভাষ্য, তদন্ত ও মামলার নথির বাইরে এ ধরনের নাম উল্লেখ বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা বা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা হতে পারে। বর্তমানে মামলাটি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তিতর্ক শেষ হলে আদালত রায়ের তারিখ নির্ধারণ করবেন।

মামলার আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ জাগো বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত স্টেট ডিফেন্স লয়ার হিসেবে এই মামলায় আসামিপক্ষের দায়িত্ব পালন করছি। আজকের কার্যক্রম ছিল ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামি পরীক্ষা। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় রায় ও যুক্তিতর্কের আগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আজ সেই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং আদালত আগামীকাল মামলার যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছেন।’

সোহেল রানার বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসামি সোহেল রানা বিজ্ঞ আদালতে বলেছেন, ‘মাননীয় আদালত আমি ভুল করেছি, আমাকে মাফ করেন।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, “এটাকে দোষ স্বীকারই বলা যায়। আপনারা আদালতে উপস্থিত ছিলেন, আমিও ছিলাম। আপনারা যা শুনেছেন, আমিও তাই শুনেছি।’

ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রক্রিয়া হবে। যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ, যুক্তিতর্ক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তার ভিত্তিতে যে বিচার আসবে, তাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস পাবে না বলে আমরা আশা করি।

মামলার বিবরণ:
গত ১৯ মে পল্লবীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা করেন। ঘটনার পর স্বপ্না আক্তারকে প্রথমে আটক করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা অপরাধের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

গত ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চার্জশিট গ্রহণ করে মামলাটি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

অভিযোগপত্রে প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে চার্জশিট প্রস্তুত করা হয় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একই দিন গত ২৪ মে ঢাকা মহানগর শিশু সংহিসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত চার্জশিট আমলে নিয়ে ১ জুন দিনটি অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য নির্ধারণ করেন। গত ১ জুন থেকে ধারাবাহিকভাবে শুনানিতে মামলাটি এগিয়ে চলছে।

এই মামলায় আসামি সোহেল রানার পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। এ মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (স্পেশাল পিপি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ এ সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার স্বার্থে আজিজুর রহমান দুলুকে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

আ. দৈ./কাশেম


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝