জাতিসংঘের সতর্কতা জারি
এল নিনোর প্রভাবে চরম তাপদাহের ঝুঁকি বেড়ে যাবে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ (ইউএন)। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, আগামী মাসগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় সম্ভাব্য মানবিক, স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষকে এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ওপর পড়বে এবং অনেক দেশেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে বৈশ্বিক উষ্ণতা।
ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, এল নিনো সাধারণত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলের অনেক দেশ এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যে প্রকট, সেখানে খাদ্য নিরাপত্তা, পানি সংকট এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, তীব্র গরমের কারণে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন। অতিরিক্ত তাপমাত্রার ফলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদ্রোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার প্রকোপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো প্রাকৃতিক জলবায়ুগত একটি ঘটনা হলেও বর্তমানে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠছে। শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং বন উজাড়ের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বেড়েছে, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ দেশগুলোকে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার, স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষি খাতে অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যেই তাপপ্রবাহের প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। অনেক দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও দাবানল ও খরার ঝুঁকি বেড়েছে। আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, এল নিনোর পূর্ণ প্রভাব আগামী কয়েক মাসে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ এবং জনগণকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় ভবিষ্যতে এ ধরনের তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং আরও মারাত্মক আকারে দেখা দিতে পারে। জাতিসংঘের সতর্কবার্তায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, এল নিনো শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং মানবজীবনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এখনই সমন্বিত প্রস্তুতি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।
আ.দৈ/আরএস




















