উত্তরায় গার্ডার দুর্ঘটনা নিহত ৫ মামলার দুই চীনা নাগরিকসহ ১২ জনের নামে চার্জশিট
নিজস্ব প্রতিবেদক :

রাজধানীর উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণাধীন অংশ থেকে কংক্রিটের গার্ডার পড়ে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন।২০২২ সালের ১৫ আগস্ট বিকেল ৪টার ঘটনা। ওইদিন বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে এ ঘটনা ঘটেছে। অবশেষে দুই চীনা নাগরিকসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে অনুমতি ছাড়া সরকারি ছুটির দিন কাজ করা, নিরাপত্তা বিধি অমান্য ও দায়িত্বে অবহেলার তথ্য।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক মুনিরুজ্জামান গত ৩০ এপ্রিল এই অভিযোগপত্র ঢাকার আদালতে দাখিল করেন। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩০ জুন দিন ধার্য করেন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জাকির হোসাইনের আদালত।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট সরকারি ছুটি থাকায় বিআরটি প্রকল্পে কোনো ধরনের নির্মাণকাজ পরিচালনার অনুমতি ছিল না। চুক্তি অনুযায়ী ছুটির দিনে কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু সেই নিয়ম না মেনেই প্রকল্পের কাজ চালানো হয়। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না গেঝুবা গ্রুপের প্রতিনিধি সুন লেই ও শিয়াং জিয়াও সেদিন মোবাইল ফোনে নির্দেশ দিয়ে শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের ঘটনাস্থলে কাজ করতে বলেন। এরপর উত্তরার প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে ক্রেনের মাধ্যমে বিশাল আকৃতির বক্স গার্ডার স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, চীনা নাগরিক সুন লেই ও শিয়াং জিয়াও, ক্রেনচালক আলামিন হোসেন ওরফে হৃদয়, তার সহকারী রাকিব হোসেন, সিগনালম্যান রুবেল ও আফরোজ মিয়া, সেফটি ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকার আলী, ইফসকন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইফতেখায়ের ও আজহারুল ইসলাম মিঠু, তোফাজ্জল হোসেন, বিলট্রেড গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন মৃধা এবং মনজুরুল ইসলাম।
তদন্ত কর্মকর্তা মুনিরুজ্জামান বলেন, তদন্তে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দুই চীনা নাগরিক বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং তারা পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে। বাকি আসামিরা জামিনে রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ পরিচালনা করা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ছিল কাজের পরিকল্পনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও কারিগরি বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ ও অনুমোদন করা। কিন্তু ঘটনার দিন দায়িত্বশীল কোনো পরামর্শক কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। একই সঙ্গে নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি।
দুর্ঘটনার পরদিন নিহত রিয়ার মামা আফরান মণ্ডল বাবু উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন। তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ক্রেনচালক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ আনেন।
চার্জশিট নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় আফরান মণ্ডল বলেন, আমরা পুরো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলাম। কিন্তু অভিযোগপত্রে ব্যক্তিদের নাম এসেছে। কোম্পানির দায়ও নির্ধারণ হওয়া দরকার ছিল। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করছেন। আসামি মনজুরুল ইসলাম ও রাকিবের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, মনজুরুল ঘটনাস্থলে ছিলেন না। আর রাকিব মূল চালকের সহকারী। তাদের অন্যায়ভাবে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে, তোফাজ্জল হোসেন ও রুহুল আমিনের আইনজীবী তাইবুর রহমান তুহিন বলেন, তাদের বিরুদ্ধে অবহেলার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। তদন্তে প্রকৃত দায়ীদের দায় কতটা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিও আদালতে পর্যালোচনা হবে। তিনি বলেন, চার্জশিট যেহেতু আদালতে গেছে, এখন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিষয়টি মোকাবিলা করা হবে।
সেদিন কী ঘটেছিল?
ঘটনার দিন ৫০ টন ওজনের বক্স গার্ডার রাস্তার এক পাশ থেকে অন্যপাশে সরানো হচ্ছিল। ক্রেন হেলপার প্রথম বক্স গার্ডারটি লরিতে উঠাতে সক্ষম হলেও দ্বিতীয় বক্স গার্ডারটি ক্রেন দিয়ে লরিতে তোলার সময় ক্রেনটি হেলে পড়ে এবং বক্স গার্ডারটি প্রাইভেটকারের উপর গিয়ে পড়ে। এতে বক্স গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে প্রাইভেটকার আরোহী রুবেলসহ পাঁচজন প্রাণ হারান। নবদম্পতি হৃদয় ও রিয়া মিন গুরুতর আহত হন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, গার্ডার স্থানান্তরের সময় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাস্তার দুই পাশে ব্যারিকেড দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। সড়কে যান চলাচলও পুরোপুরি বন্ধও করা হয়নি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ক্রেনচালক নিজে দায়িত্ব পালন না করে তার সহকারী রাকিবকে দিয়ে ক্রেন পরিচালনা করান। অথচ রাকিবের এ ধরনের ভারী যন্ত্র পরিচালনার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছিল না। এছাড়া ক্রেনটি যেখান থেকে পরিচালনা করা হচ্ছিল, সেই জায়গার মাটি ছিল নরম ও ভেজা। তবুও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রথম গার্ডারটি সফলভাবে তোলা গেলেও দ্বিতীয় গার্ডার স্থানান্তরের সময় ক্রেনটি ভারসাম্য হারিয়ে হেলে পড়ে। একপর্যায়ে বিশাল গার্ডারটি নিচে থাকা একটি প্রাইভেটকারের ওপর আছড়ে পড়ে।
আ. দৈ./কাশেম




















