অপরাধ ট্রাইব্যুানালে চিফ প্রসিকিউটর
শাপলা চত্বরে হত্যাকান্ডের তথ্য গায়েবের চেষ্টা ছিল সাংবাদিক বাবু ও রুপার
নিজস্ব প্রতিবেদক :

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৩ সালে ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে রাতের আধারে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ভূমিকা রেখে ছিলেন সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা। ওইদিন হত্যাকাণ্ড ,নিরীহ আলেম ও মাদ্রাসার ছাত্রদের ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং মৃত্যুর তথ্য লুকানোর প্রচেষ্টায় ছিলেন ওই দুই সাংবাদিক। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় বিচারিক আদালতে এসব তথ্য তুলে ধনের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
তিনি আদালতকে বলেছেন, তারা ঘটনার প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনে মৃত্যুর তথ্য আড়াল করতে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল।
আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। আগামী ৭ জুন এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে ঘটনার পরপরই ‘সমীকরণ’ নামের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছিল একাত্তর টেলিভিশনে। ওই প্রতিবেদনে এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় যে, শাপলা চত্বরে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঘটনার পরপরই এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের প্রয়োজন কেন হলো? এত দ্রুত কাজটি কেন করা হলো? এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পরপরই প্রতিবেদনটি প্রচার করা হয়েছিল। শাপলা চত্বরে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা ঘটার পর সেটি ভিন্ন খাতে নিতে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেন ফারজানা রুপা।
প্রসিকিউশনের দাবি, শাপলা চত্বরের প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার ক্ষেত্রে মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মৃত্যুর তথ্য লুকানোরও চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের এই প্রচেষ্টা ছিল একটি সিস্টেমেটিক অ্যাটাকের অংশ। তারা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পদ্ধতিগতভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করছেন। কারণ তাদের প্রচারিত প্রতিবেদনে কোনো সত্যতা ছিল না; সেখানে হতাহতের ঘটনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছিল।
এর আগে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেন। আগামী ৭ জুন এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতে এদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। তিনি আসামিদের গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে, গত ৭ মে দীপু মনি, মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপাকে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সকালে কারাগার থেকে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানির সময় তারা এজলাসের কাঠগড়ায় ছিলেন।
প্রসিকিউশন সূত্র মতে, শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ওই সমাবেশ কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত ৫৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লায় একজন। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হবে। মামলাটি তদন্তাধীন।
মামলায় আগেই ছয়জন আসামি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে। তারা হলেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির এবং সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল।
শাপলা চত্বরের এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে তিনি এ অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় মোট ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক সংসদ সদস্য হাজী সেলিম, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার, একাত্তর টিভির সাবেক সিইও মোজাম্মেল হক বাবু, সময় টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আহমেদ জোবায়ের, এবিনিউজ ২৪ ডটকমের সম্পাদক সুভাষ সিংহ রায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাইমুল ইসলাম খান, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ এবং এনএসআইয়ের মো. মনজুর আহমেদ।
আ. দৈ./কাশেম




















