টরোন্টোতে বাংলাদেশি–কানাডীয় রাজনীতিকের প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বাংলাদেশি–কানাডীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক সংগঠক আহসানুল হাফিজ অন্টারিওর স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনে লিবারেল পার্টির মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করছেন। তবে, তার প্রার্থিতা নিয়ে কানাডার বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক কর্মী এবং অন্টারিও প্রদেশের লিবারেল পার্টির অভ্যন্তরীণ মহলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশে তার পারিবারিক রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।
অন্টারিওর প্রাদেশিক এই আসনটি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী প্রথম কানাডীয় সংসদ সদস্য হিসেবে ডলি বেগম সম্প্রতি নির্বাচিত হওয়ায় শূন্য হয়েছে।
জানা গেছে, হাফিজ ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে কানাডায় যান, উইন্ডসর ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন এবং পরে অন্টারিওর লন্ডন শহরে ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন।
আহসানুল হাফিজের পিতা কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া খুলনার রাজনৈতিক মহলে একজন শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যিনি বাংলাদেশে চীনপন্থী কমিউনিস্ট কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়।
টরন্টো-ভিত্তিক এক বাংলাদেশি আইনজীবী তার অতীত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রমের প্রসঙ্গে বলেন, কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়া কাগজপত্রে হাফিজের নামে কিছু স্ক্রিনশট রয়েছে, যেখানে তিনি জামায়াতে ইসলামী-এর নেতা যেমন দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী এবং আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এমন পোস্ট রয়েছে যা ফাঁসিকে উদযাপন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহারের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আইনজীবী বলেন, “এই বিষয়টি একটি উদ্বেগে পরিণত হয়েছে, কারণ কানাডার সরকারি নীতি দৃঢ়ভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে। কানাডা 'সেকেন্ড অপশনাল প্রোটোকল টু দ্যা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন সিভিল এন্ড পলিটিকাল রাইটস'-এ স্বাক্ষর করেছে, যার লক্ষ্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা, এবং ফেডারেল সরকার সবসময় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান বজায় রেখেছে।”
হাফিজের সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ফাঁসির পক্ষে অবস্থান নেওয়া কেউ কীভাবে অন্টারিওতে লিবারেল পার্টির ব্যানারে নির্বাচন করতে পারেন, যেখানে মানবাধিকার, আইনের শাসন, বহুত্ববাদ এবং মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা মূল রাজনৈতিক মূল্যবোধ।
একজন কমিউনিটি সংগঠক বলেন, “হাফিজের সমর্থকরা বলতে পারেন যে পোস্টগুলো পুরনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—যিনি রাজনৈতিক শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করেছেন, তিনি কীভাবে তার সেই অবস্থান বর্তমান কানাডীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করেছেন?”
খুলনায় হাফিজের প্রতিবেশীরা জানান, তার পরিবারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে ওবায়দুল কাদের-এর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলোতে অভিযুক্তদের তালিকায় ওবায়দুল কাদেরের নামও রয়েছে।
বাংলাদেশে যখন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন, তখন হাফিজ কানাডা থেকে আওয়ামী লীগের স্বার্থে এবং জুলাই বিপ্লবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া, প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। খালেদা জিয়াসহ অন্যদের অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, এমনকি তাদের পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানো হয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি প্রচলিত অবমূল্যায়নমূলক কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
লিবারেল পার্টির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়, দলটির কিছু ইসরায়েলপন্থী ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী হাফিজকে সমর্থন দিচ্ছেন। এটি সাবেক মন্ত্রী নাথানিয়াল এর্সকিন স্মিথ-এর সঙ্গে একটি বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি একই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং কানাডার রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের জন্য পরিচিত।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব বিষয় ইঙ্গিত দেয় যে এই মনোনয়ন লড়াইটি একটি স্থানীয় আসনের প্রতিযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিভাজনের অংশ হয়ে উঠেছে। যার মধ্যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যু, প্রবাসী বাংলাদেশি রাজনীতি এবং অন্টারিও লিবারেল পার্টির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্ক অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হাফিজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আ. দৈ./কাশেম




















