প্রবীণদের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা নবীনদের কাজে লাগাতে হবে: সমাজকল্যাণ মন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক

সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে দেশের নবীন প্রজন্মের কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তিনি বলেন, কর্মজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার অর্থ কোনোভাবেই সমাজে একজন মানুষের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু স্বাধীনতার সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একসময় দেশের মানুষের গড় আয়ু ৪৭ থেকে ৪৮ বছরের মধ্যে ছিল। তখন ৪৮ থেকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকাকেই দীর্ঘ জীবন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার প্রসারসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছরের কোটা অতিক্রম করেছে।
তিনি বলেন, মানুষের আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে প্রবীণদের বিষয়ে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ৫৯ বছর বয়সে এবং অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আরও কিছুটা বেশি বয়সে অবসরের সুযোগ রয়েছে। একজন কর্মঠ মানুষকে হঠাৎ করে কর্মজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে এর নেতিবাচক প্রভাব তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়তে পারে।
মন্ত্রী বলেন, আজ পর্যন্ত যিনি নিয়মিত অফিস করেছেন, আগামীকাল থেকে তাকে বলা হচ্ছে আর অফিসে আসার প্রয়োজন নেই- এই পরিবর্তনটি একজন কর্মক্ষম মানুষের জন্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে কঠিন। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একজন মানুষকে ধীরে ধীরে নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
অবসর-পরবর্তী জীবনকে নতুনভাবে পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক কর্মজীবন শেষ হওয়ার পরও একজন মানুষের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করার, সমাজে অবদান রাখার এবং নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষের কাজ করার ইচ্ছা, সক্ষমতা ও কর্মক্ষেত্র থাকলে বয়স কোনো বাধা হতে পারে না। প্রবীণদের মধ্যে অনেকেরই দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা কোনো বই পড়ে বা একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করে একদিনে পাওয়া সম্ভব নয়। এই অভিজ্ঞতা দেশের নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ।
মন্ত্রী বলেন, ‘অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। একজন মানুষ পিএইচডি করতে পারেন, অনেক পড়াশোনা করতে পারেন; কিন্তু বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সময় লাগে। আমাদের প্রবীণদের মধ্যে সেই অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের এই জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, প্রবীণদের মধ্যে এমন অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা বর্তমান প্রজন্ম ইচ্ছা করলেও অর্জন করতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম চাইলেও মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়টিতে ফিরে যেতে পারবে না। যারা সেই সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী প্রবীণদের সুস্থতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা, পরামর্শ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু রাজধানীর একটি বা কয়েকটি কেন্দ্রে প্রবীণসেবা সীমাবদ্ধ না রেখে তা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের ৬৪টি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ন্যূনতম মানসম্পন্ন প্রবীণসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। বিপুলসংখ্যক প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু একটি সংগঠন বা একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংগঠন এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সেবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহজলভ্যতা ও প্রবেশযোগ্যতা। ঢাকাকেন্দ্রিক সেবার পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিতে হবে। এ বিষয়ে সরকার নতুন করে চিন্তাভাবনা করছে এবং পর্যায়ক্রমে উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রবীণদের বিভিন্ন ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতেও প্রবীণদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিবারের নারী সদস্যের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নও বাড়ছে।
মন্ত্রী জানান, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা শুধু শহরকেন্দ্রিক না রেখে দেশের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকার কাজ করছে। জেলা, বিভাগ ও উপজেলা পর্যায়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রবীণদের প্রতি তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রবীণদের কাছ থেকে পাওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ সরকারের নীতি ও কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করতে পারে। তাদের চিন্তা ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রবীণদের মতামত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভাজন করা হবে না। প্রবীণদের কল্যাণে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে কাজ করা হবে।
এর আগে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের র্যালিতে অংশ নেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের সচিব, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রবীণ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রবীণ ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এবারের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। প্রতিপাদ্যের আলোকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মর্যাদা, অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগানোর ওপর অনুষ্ঠানে গুরুত্বারোপ করা হয়।
আ দৈ/ এস এন




















