আমানতের সুরক্ষা দ্বিগুণ ও ৫ ব্যাংক একীকরণ
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অর্থমন্ত্রীর যুগান্তকারী ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনৈতিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু কঠোর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সংকটগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামি ব্যাংককে একত্রিত করে 'সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক পিএলসি' নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান রূপদান করা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা বাড়াতে বীমা সুবিধার আওতায় সুরক্ষিত অর্থের পরিমাণ এক লক্ষ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে দুই লক্ষ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের আর্থিক খাতের এই নতুন রূপরেখার কথা বিশদভাবে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী এ কথা জানান। উক্ত আইনপ্রণেতা ব্যাংকিং খাত সচল করতে সরকারের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন।
সংসদকে আশ্বস্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতকে আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুবিন্যস্ত ও বহুমাত্রিক পুনরুদ্ধার কাঠামো তৈরি করেছে। আইনি ভিত্তি হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে 'ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬' পাস করা হয়েছে, যার অধীনেই পাঁচটি দুর্বল ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন কার্যকর হওয়া 'আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬'-এর অধীনে এখন থেকে গ্রাহকদের গচ্ছিত অর্থের নিরাপত্তা সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে। শুধু ব্যাংক নয়, অতীতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (ফাইন্যান্স কোম্পানি) গ্রাহকরা এই নিরাপত্তার বাইরে থাকলেও বর্তমান আইনের সুবাদে তারাও এখন থেকে এই সুরক্ষার আওতায় আসবেন।
সংসদ অধিবেশনে খেলাপি ঋণ উদ্ধার এবং ঋণ বিতরণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথাও জানানো হয়। এখন থেকে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ খেলাপি হচ্ছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশেষ সার্কুলার জারি করা হয়েছে এবং খুব দ্রুতই এই ধরনের ঋণখেলাপিদের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমাতে একক কোনো গ্রাহক পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বড় অঙ্কের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আদালতের আইনি জটিলতা এড়াতে এবং খেলাপিরা যাতে রিট আবেদনের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখতে না পারেন, সেজন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অর্থ ঋণ আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে গতি আনতে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা যেমন রয়েছে, তেমনি বেসরকারি উদ্যোগে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা এএমসি গঠনের জন্য নতুন আইন তৈরি হচ্ছে। ঋণ সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে নিয়মিত যারা কিস্তি পরিশোধ করেন, সেই ভালো গ্রাহকদের পুরস্কৃত করার নীতিও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।
আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের মোট খেলাপি ঋণের অন্তত এক শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকা ধরে নিয়মিত তদারকি এবং যেসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের ওপরে, সেগুলোর জন্য বিশেষ নজরদারি দল গঠন করা হয়েছে।
সুস্পষ্ট আইনি সংস্কার, স্বচ্ছ একত্রীকরণ প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার এই ত্রিমুখী কৌশল দেশের আর্থিক খাতে গ্রাহক ও অংশীজনদের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনবে বলে অর্থমন্ত্রী দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেন।
আ.দৈ/আরএস/এএইচএইচজ




















