আওয়ামী আমলে বিএনপি তকমা
নিয়মের দোহাই দিয়ে ব্যাংকার গোলাম মর্তুজাকে ঠেকাতে মরিয়া একটি সিন্ডিকেট
বিশেষ প্রতিনিধি

বিশেষ প্রতিনিধি: দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা, বৈদেশিক বাণিজ্য ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পরও পদোন্নতি নিয়ে জটিলতায় পড়েছেন ব্যাংকার মোহাম্মদ গোলাম মর্তুজা। বিগত আওয়ামী আমলে তাঁর ক্যারিয়ার ও পদোন্নতিতে বারবার রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করা হয়েছে।
অথচ রূপালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম ফরিদ উদ্দীন ১৯৯৮ ব্যাচের যে তিন কর্মকর্তাকে ব্যাংকার হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন, তাদের একজন হিসেবে গোলাম মর্তুজার নাম উল্লেখ করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে একাধিকবার তাঁর পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পরও ‘নিয়মের বেড়াজাল’ দেখিয়ে তাঁর পদোন্নতি ঠেকানোর চেষ্টা করছে একটি সিন্ডিকেট। এর আগে ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিএনপি তকমা দিয়ে গোলাম মর্তুজার জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) থেকে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) পদে পদোন্নতি হয়নি।
এর পেছনে তৎকালীন সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে জমা হওয়া একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়টি সামনে এনে তা পদন্নোতি আটকে দেয়া হয়। জানা গেছে ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকার আমলে কেরানী থেকে রুপালী ব্যাংকের এমডি বনে যাওয়া ওয়াবাইদুল কাদেরের ডান হাত খ্যাত মো. জাহাঙ্গীর এর রোষানলে পড়ে ২ বার প্রমোশন আটকে যায় তার।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাঁকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁর এক ভাই স্থানীয় উপজেলা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিএনপির সমর্থনে দুবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন—এমন তথ্যও ওই অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
‘এক শ্রেণির কর্মকর্তা-আমলা পদোন্নতি ঠেকাতে সক্রিয়’
জানা গেছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধা পাওয়া কিছু ব্যাংকার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কিছু কর্মকর্তা এখনো তাঁর পদোন্নতির বিরোধিতা করছেন। তাঁকে ঠেকাতে বিভিন্ন কৌশল ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকারের পদোন্নতি বারবার আটকে থাকবে কি না। তাদের যুক্তি, অতীতে বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকে নানা বিতর্ক বা প্রশ্ন থাকা কর্মকর্তারাও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে গোলাম মর্তুজার ক্ষেত্রে নিয়মের প্রয়োগ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আড়াই দশকের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা
১৯৯৮ সালে ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটির মাধ্যমে সরাসরি সিনিয়র অফিসার হিসেবে রূপালী ব্যাংকে যোগ দেন মোহাম্মদ গোলাম মর্তুজা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ আদায়, বৈদেশিক বাণিজ্য, ট্রেজারি ও এসএমই ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। রূপালী ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে পরপর তিন বছর বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ বিতরণ ও খেলাপি ঋণ আদায়ে সেরা ব্যবস্থাপক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। ২০১৮ সালে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে জিএম হিসেবে শিল্পঋণ বিভাগের দায়িত্ব পান তিনি। পরবর্তী সময়ে প্রায় পাঁচ বছর হেড অব ক্রেডিট এবং হেড অব ফরেন ট্রেড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে এসএমই উদ্যোক্তা ও নতুন রপ্তানিকারক তৈরির পাশাপাশি ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রম সম্প্রসারণে ভূমিকাও পালন করেন তিনি।
করোনাকালে প্রণোদনা ঋণ বিতরণ
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় সরকারি প্রণোদনা ঋণ বিতরণ কার্যক্রমেও দায়িত্ব পালন করেন গোলাম মর্তুজা। ওই সময়ে তাঁর উদ্যোগে রূপালী ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা ও রপ্তানিকারকদের ব্যবসা সচল রাখতে সহায়তা করা হয়। এ ভূমিকার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিশেষ প্রশংসাপত্র দেয় বলেও জানা গেছে। ২০২২ সালে তাঁর নেতৃত্বে রূপালী ব্যাংক কৃষি ঋণ বিতরণে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে সনদ পেয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জনতা ব্যাংকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
২০২৩ সালে জনতা ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর ঋণ আদায় ও বৈদেশিক বাণিজ্যে তাঁর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হয়। তাঁকে ব্যাংকটির হেড অব ফরেন ট্রেড হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সেখানে টানা প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালনের সময় ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ও ঋণ আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও তাঁর কাজের প্রশংসা করেছে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনতা ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও প্রায় দুই মাস দায়িত্ব পালন করেন গোলাম মর্তুজা। ওই সময়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য এবং ট্রেজারি ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসের বেশি সময় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গোলাম মর্তুজা। তাঁর সময়ে ব্যাংকটির আমানত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বাড়ে এবং খেলাপি ঋণের হার ৩১ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে নেমে আসে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এ ছাড়া প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কৃষক পরিবারকে ঋণমুক্ত করার উদ্যোগেও রাকাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের বিস্তারিত সরকারি নথি ও স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সনদও রয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্যে
গোলাম মর্তুজার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বৈদেশিক বাণিজ্যে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও সনদ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে সরকারি ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি একমাত্র আইসিসি সার্টিফায়েড ফরেন ট্রেড স্পেশালিস্ট। রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও রাকাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এসএমই ও বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ে প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া অনেক কর্মকর্তা বর্তমানে ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
পদোন্নতি নিয়ে এখন যে প্রশ্ন
প্রায় আড়াই দশকের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে একাধিক সরকারি ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন, বৈদেশিক বাণিজ্য ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সাফল্যের দাবি থাকা সত্ত্বেও গোলাম মর্তুজার পদোন্নতি কেন বারবার আটকে যাচ্ছে—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। তাঁর সমর্থকদের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। এখন সরকার পরিবর্তনের পরও যদি ভিন্ন কোনো অজুহাতে একইভাবে তাঁর পদোন্নতি আটকে রাখা হয়, তাহলে ব্যাংকিং খাতে মেধা, দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
আ.দৈ/আরএস




















