পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে খেয়াল খুশিমতো কাজ করছে রাকাবের এমডি
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগমকে নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। আদালত অবমাননাসহ নিয়মনীতি অমান্যের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। আর্থিক অনিয়মের দায়ে তাকে কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। পরে সে তথ্য গোপন করে পদোন্নতি পান। আরও অভিযোগ উঠেছে, রাকাবে আওয়ামীপন্থিদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় তার অপসারণ ও শাস্তি চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়েছে। এই রিটের পক্ষে রুল জারি করেছেন উচ্চ আদালত।
এছাড়া আওয়ামী তোষণ করে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়া ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে রয়েছে অদক্ষতা এবং ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগও আছে। অভিযোগ রয়েছে, ওয়াহিদা বেগম অগ্রণী ব্যাংকে কর্মরত থাকা অবস্থায় ঘুষ দিয়ে পদোন্নতি এবং বদলি বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন। এছাড়া অতিরিক্তি ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ তার ভাসুর। আহসান হাবীব পলাশ অতিরিক্ত আইজিপি ও আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বনজ কুমার মজুমদারের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা রয়েছে। ওয়াহিদা শ্বশুড়বাড়ী গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলায়, সেখানকার বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি মাইনুল হাসান সাদিক বলেন ডিআইজি পলাশের পুরো পরিবার আওয়ামী ঘনিষ্ট। সুত্র আরও জানায় পদোন্নতি নেওয়ার জন্য ২০২৩ ওয়াহিদা উপজেলা আওয়ামী লীগ থেকে প্রত্যয়ন পত্র নিয়েছেন যা অর্থ মন্ত্রনালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে জমা ও দিয়েছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওয়াহিদা বেগমের জন্ম নোয়াখালীতে। সেই সুবাদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। অগ্রণী ব্যাংকে দায়িত্বপালনকালে তিনি সেখানকার বঙ্গবন্ধু পরিষদের উপদেষ্টা ছিলেন। আরও আগে রূপালী ব্যাংকে দায়িত্বপালনকালে সেখানকার বঙ্গবন্ধু পরিষদেরও উপদেষ্টা ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে- জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা দক্ষিণ সিটির সেই সময়কার মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে মোটা অঙ্কের অর্থ জোগান দেন।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ সূত্রে জানা যায়, পদোন্নতি পেয়ে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ওয়াহিদা বেগম রাকাবে বদলি হয়ে আসেন। তার আগে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসিতে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ছিল। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি ওয়াহিদা বেগমসহ অগ্রণী ব্যাংকের চার কর্মকর্তাকে আদেশ অমান্য করার দায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। কিন্তু সেই তথ্য গোপন করে কৌশলে রাকাবে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন ওয়াহিদা বেগম।
রাকাবে যোগদানের পর তিনি ব্যাংকের আওয়ামীপন্থিদের পুনর্বাসন করছেন। রাকাবে তার নির্দেশে আওয়ামী দোসর কর্তৃক ৩৬-শে জুলাই বীর শহীদদের ছবি সংবলিত ব্যানার ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির ব্যানার ছিঁড়ে পদদলিত করে শহীদদের প্রতি অবমাননা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিএনপি মহানগর কর্তৃক প্রতিবাদ সভা হয়। বিএনপি মহানগর কর্তৃক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা বরাবর স্মারকলিপি দাখিলের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের দাবি জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। রাকাবে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট দোসরদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি সংগঠিত করছেন। ব্যাংকের ভেতর নিজ মতাদর্শের দলীয়করণ, সুবিধাজনক স্থানে পছন্দমতো পদায়ন, মতবিরোধীদের যত্রতত্র নির্বাসন এবং প্রশাসনিক ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে ভীতিকর কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। ফলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।
এছাড়া গত অর্থবছরে ১৩২ কোটি টাকা গচ্চা দিয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। অভিযোগ রয়েছে, উত্তরের এই বিশেষায়িত ব্যাংকটির লোকসান কেবল ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওয়াহিদা বেগমের অদক্ষতা, অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই। পরিচালনা পর্ষদকে পাশ কাটিয়ে নিজের খেয়াল খুশিমতো ব্যাংক চালানোর অভিযোগ রয়েছে এমডির বিরুদ্ধে। আর তাতে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে রাকাবে। বাড়ছে বিভেদ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা। এই ঘটনায় এমডিকে কৈফিয়ত তলব করেছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ৯ মার্চ রাকাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পান আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত ওয়াহিদা বেগম। যোগদানের ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও রাকাবের উন্নয়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি তিনি। উল্টো দায়িত্ব নেওয়ার পর চেয়ারম্যান-পরিচালকদের পাশ কাটিয়ে খেয়াল খুশিমতো ব্যাংক চালাতে শুরু করেন। ফ্যাসিবাদের সমর্থকদের পুনর্বাসন করে নিজস্ব সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এতে ব্যাংকজুড়ে চরম অসন্তোষ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে।
এমডির এই কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ পরিচালনা পর্ষদ। গত ৩ ও ১২ নভেম্বর দুই দফা এমডিকে কৈফিয়ত তলব করেছেন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আলী। কিন্তু চেয়ারম্যানের সেই কৈফিয়তের জবাবই দেননি এমডি। অভিযোগ উঠেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ আউট সোর্সিং কোম্পানির সঙ্গে গোপন আঁতাত করে ৭২১ জন নিরাপত্তা প্রহরী ও অফিস সহায়কদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ও কমিশনের ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এমডি।
জানা যায়, আউট সোর্সিং কোম্পানির সঙ্গে জনবল সরবরাহের চুক্তিটি ২০২৩ সালে ১৬ এপ্রিল ৫৬১তম সভায় নবায়ন করে পরিচালনা পর্ষদ। চলতি বছরের ৩১ জুলাই সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আউট সোর্সিং কোম্পানি নিয়োগ করার কথা। কিন্তু তা না করে এমডি বিধি-বহির্ভূতভাবে এই খাতে প্রায় ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন। সর্বশেষ পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে গত ২০ নভেম্বর তিনি সীমিত টেন্ডারের উদ্দেশ্যে তালিকাভুক্তির নোটিশ জারি করেন। এই ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদের নেওয়া সিদ্ধান্ত এমডি বাস্তবায়ন করছেন না বলে অভিযোগ করেছেন খোদ চেয়ারম্যান।
অভিযোগ রয়েছে, এমডি ব্যাংকের স্পর্শকাতর ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ডাটা সেন্টারের টেন্ডার সংক্রান্ত যাবতীয় বিল আটকে দিয়েছেন। এই ঘটনায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে ব্যাংকের সার্বিক নিরাপত্তা। এনিয়ে বার বার সতর্ক করার পরও আমলে নিচ্ছেন না এমডি। চেয়ারম্যানের অভিযোগ, এমডির এই আচরণ চরম রহস্যজনক। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তিনি বৈধ বিল পরিশোধে কালক্ষেপণ করছেন। এ
দিকে চলতি বছরের মে মাসে চুক্তির মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে প্যানেল আইনজীবীদের। নতুন করে আইনজীবী নিয়োগ না দিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ আইনজীবী প্যানেল দিয়েই কোর্টে ব্যাংকের মামলা চালাচ্ছেন এমডি। দিচ্ছেন মামলা পরিচালনার বিলও। যা পুরোপুরি বেআইনি ও অবৈধ বলে অভিযোগ এনেছেন চেয়ারম্যান।
এতে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে জানিয়ে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন চেয়ারম্যান। কিন্তু তা কানে তুলছেন না এমডি। এমডির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, চলতি বছরের জুন ভিত্তিক পদোন্নতি আটকে দিয়েছেন তিনি। এতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দ্রুতই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান। কিন্তু তা আমলে নেননি এমডি। উল্টো চেয়ারম্যানকে না জানিয়ে ২০ জনকে প্রধান কার্যালয় থেকে রংপুর বিভাগে বদলি করেন। এমপির একতরফা ও অযৌক্তিক এই সিদ্ধান্তে ব্যাংকজুড়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে পতিত স্বৈরাচার ও খুনি সরকারের আমলে যারা রাকাবে জুলুম-নির্যাতন ও বৈষম্য সৃষ্টি করেছিলেন তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতা দেন এমডি। তাদের প্রধান কার্যালয়ে সংগঠিত করার অভিযোগ আনেন চেয়ারম্যান।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের পদ বাঁচাতে উচ্চপদস্থ কতিপয় কর্মকর্তাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত আবাসন সুবিধা দেন। আটকে দেন ইসলামি ব্যাংকিং বাস্তবায়ন। এমডির পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নীতি ভেঙে দু’দিনের পরিবর্তে সাপ্তাহিক ছুটি ৩ দিন ভোগ করছেন।
অভিযোগ বিষয়ে রাকাব এমডি ওয়াহিদা বেগমকে একাধিকবার ফোন ও ম্যাসেজ দিয়ে তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।




















