রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার এনআরবিসি ব্যাংকের অবৈধ বোর্ড সভা করা হচ্ছে
নানা অনিয়মের অভিযোগ চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়ার বিরুদ্ধে
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৫, ৮:৩২ পিএম   (ভিজিট : ১৬৯)
X

পরিচালন-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা করপোরেট গভর্নেন্স ভেঙ্গে পড়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি’র (এনআরবিসি)। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য, পেশাদারিত্বের অবমূল্যায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। 

হাসিনার ব্যাংকিংখাতে লুটপাটের মধ্যেও ভালো করা ব্যাংকটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তার স্বার্থ হাসিলে গত ১২ মার্চ পরিচালনা পরিষদ (বোর্ড) ভেঙ্গে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়। নতুন বোর্ড নানাবিধ অপকর্মের মাধ্যমে স্থিতিশীল ব্যাংকটিকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া সার্বক্ষনিক অফিস করছেন। 

এমনকি রাত ১১-১২টা পর্যন্তও। ব্যাংকের কোন কাজ না করে নিয়োগ ও কমিশন বাণিজ্যসহ নিজস্ব কার্যক্রম বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের একটি গ্রুপকে রাত অবধি অফিসে বসিয়ে রাখেন। এদিকে অবৈধভাবে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত এনআরবিসি’র বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন করার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পরিচালনা পরিষদের বিরুদ্ধে। আগামীকাল বৃহষ্পতিবার এই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ‘নো ডিভিডেন্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ গত বছরও ব্যাংকটি ১১ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেয়। 

অভিযোগ উঠেছে- এনআরবিসি ব্যাংকের বর্তামান বোর্ড শেয়ার হোল্ডারদের অনুমোদন না নিয়ে ব্যাংক পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি নতুন করে এজিএম এর আয়োজন করেছেন। বিষয়টিকে অবৈধ হিসেবে দেখছেন ব্যাংকটির শেয়ার হোল্ডাররা। তারা অবিলম্বে অবৈধ এই এজিএম বাতিলের আবেদন জানিয়েছেন। পাশাপাশি হাসিনার লুটপাটের মধ্যেও ভালো মানের এই ব্যাংকটির বর্তমান বোর্ড বাতিল করে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে  থেকে নতুন বোর্ড গঠন করার দাবি জানিয়েছেন। 

শেয়ারহোল্ডারদের মতে, বর্তমান পরিচালনা পরিষদ তাদের মধ্যে থেকে করা হয়নি। ব্যাংকিং কোম্পানি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বোর্ড বসিয়েছে। অন্যান্য একাধিক ব্যাংকেও এভাবে পরিচালনা পরিষদ বসানো হয়েছে। তবে অন্যান্য ব্যাংকের বোর্ড পরবর্তীতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এবং পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী আইন অনুযায়ী শেয়ারহোল্ডারদের মাধ্যমে পরিচালনা পরিষদকে বৈধ করে নিয়েছে। কিন্তু এনআরবিসি’র বর্তমান বোর্ড বিএসইসি বা পাবিলিক লিমিটেড কোম্পানী আইন অনুযায়ী শেয়ার হোল্ডারদের অনুমোদন নেয়নি। তাই এই পরিচালনা পরিষদকে অবৈধ হিসেবে দাবি করছে শেয়ার হোল্ডাররা। 

বর্তমানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া, স্বতন্ত্র পরিচালক মো. আবুল বশর, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. নুরুল হক, ব্যারিস্টার মো. শফিকুর রহমান, প্রফেসর ড. আবুল কালাম আজাদ ও মুহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ। গত ১২ মার্চ ব্যাংকটির আগের পরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন এই বোর্ড গঠন করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে। 
এনআরবিসি ব্যাংকের হেড অব কমিউনিকেশন মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, সকল নিয়ম বা অনুমতি নিয়েই এজিএম করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমতি নেওয়া হয়েছে। তাদেরকে এজিএম’র বিষয়ে জানানো হয়েছে। 

এদিকে চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাংকের নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন শেয়ার হোল্ডাররা। প্রধান উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টা, অর্থ সচিব, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে  পাঠানো অভিযোগ থেকে জানা যায়, প্রতিদিন অফিস করছেন চেয়ারম্যান। এমনকি রাত ১১-১২টা পর্যন্তও। 

ব্যাংকের কাজ না করে নিয়োগ ও কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের সুতিকাগারে পরিণত করেছেন প্রতিষ্ঠানটিকে। নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আগে আউট সোসিংয়ের মাধ্যমে গার্ড নিয়োগ করা হতো ১২ হাজার টাকায়। যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গার্ড নেওয়া হতো ওই প্রতিষ্ঠান কমিশন হিসেবে পেতো ১ হাজার টাকা। আর বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি গার্ড নিয়োগে আগের ১২ হাজারের স্থলে ২৮ হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি কমিশন দেওয়া হচ্ছে ৬ হাজার টাকা। খরচ কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমান বোর্ডকে দায়িত্ব দিলেও তারা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে খরচ আরও বাড়িয়েছে। এমনকি বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের ব্যবসায়িক লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ৯০০ কোটি টাকা। অর্থচ ৬ মাসে মাত্র ১২৫ কোটি টাকা অপারেশনাল প্রফিট করেছে ব্যাংকটি। অথচ আগে ৬ মাসে কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা প্রফিট করতো ব্যাংকটি। 

ব্যবসায় মনযোগ না থাকলেও নিয়োগ বাণিজ্যে মেতে উঠেছে বর্তমান বোর্ড। ইতোমধ্যে ব্যাংকের চীফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও), চীফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার (সিএইচআরও), চীফ ক্রেডিট অফিসার (সিসিও), চীফ লীগাল অফিসার (সিএলও), চীফ অপারেটিং অফিসার (সিওও), চীফ ইন্টারনাল কন্ট্রোল এন্ড কমপ্লায়েন্স অফিসার, ফোকাল পয়েন্ট ইউনিট হেড, ম্যাজেমেন্ট ট্রেইনি অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শতাধিক এবং ব্যাংকের অফিসারসহ ছোট ছোট পদে নিয়োগের নামে বাণিজ্য চলছে। 

অভিযোগ রয়েছে, এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেন, পরিচিতি ও পক্ষপাতিত্বই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে- পরিচিতজনদের পছন্দের ভিত্তিতে আর্থিক বিনিময়ে এসব নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। 

এদিকে ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রমেও দেখা যাচ্ছে জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতা। এলসি খোলা বন্ধ হয়ে আছে, মাসের পর মাস ফাইল পড়ে থাকে টেবিলে, নেই কোনো প্রণোদনা বা পদোন্নতি, রাত ১১-১২টা পর্যন্ত কর্মীদের অফিসে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং চেয়ারম্যানের উদ্যোগে দামী গাড়ি ও বিলাসবহুল প্রকল্পে লাখ লাখ টাকার ব্যয়-যা অনেকে অপ্রয়োজনীয় অপচয় বলে মনে করছেন। 

এছাড়া ভয়ভীতি ও মানসিক হয়রানির অভিযোগ রয়েছে ব্যাংকটির বর্তমান বোর্ডের বিরুদ্ধে। 
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সিন্ডিকেট বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অডিট রিপোর্ট তৈরি করে চাকরিচ্যুতির চেষ্টা করছে। মামলা, মানহানিকর প্রচারণা এবং অতিরিক্ত সময় ধরে কর্মীদের অফিসে রাখা-এসব ঘটনা ব্যাংকের অভ্যন্তরে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
 
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংকের অর্থে দামী গাড়ি কেনা, বিদ্যমান ওয়াশরুম থাকা সত্ত্বেও নতুন করে ওয়াশরুম নির্মাণের নামে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের বাস্তব প্রয়োজন ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে- বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. তৌহিদুল আলমের বিরুদ্ধেও। এক সময়ে দু’জনেই অগ্রণী ব্যাংকে চাকরি করতেন। তাই নিয়মিতভাবে চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছেন এবং চেয়ারম্যানও নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থেকে ব্যাংক পরিচালনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন। যা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। 

সূত্র মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতার ওপর। কিন্তু এনআরবিসি ব্যাংকে বর্তমানে এই মূলনীতি গুলো অবহেলিত। ব্যক্তিস্বার্থে পরিচালিত সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রশাসনিক অরাজকতা প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে। 

ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের মূলনীতি-স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব। অথচ এনআরবিসি ব্যাংকে বর্তমানে এর চরম অভাব দেখা যাচ্ছে। সিন্ডিকেট ভিত্তিক নেতৃত্ব, নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অরাজকতা ব্যাংকটির ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. তৌহিদুল আলম ইনকিলাবকে বলেন, প্রতিদিনই নানা অভিযোগ আসছে। এর কোন ভিত্তি নেই। সকল নিয়ম মেনেই ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
ব্যাংক-বীমা- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝