শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
ই-পেপার

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে বিপ্লব ঘটিয়েছে বিনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১০ পিএম   (ভিজিট : ৩)
X

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২২টি ফসলের মোট ১৩৯টি উচ্চফলনশীল ও উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ৯৬টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে সরাসরি মিউটেশন ব্রিডিং বা বিকিরণ (Radiation) প্রযুক্তির মাধ্যমে।

এছাড়া বিনা এযাবৎকাল ১০টি জীবাণুসার এবং ৫৭টি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। তারা মূলত প্ল্যান্ট মিউটেশন ব্রিডিং বা পরমাণু বিকিরণ (যেমন-গামা রশ্মি, এক্স-রশ্মি বা আয়ন বিম) প্রয়োগ করে উদ্ভিদের জিনগত পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে নতুন নতুন ফসলের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে থাকে।

বিনা’র বিজ্ঞানীগণ দেশে ও বিদেশে তাদের সফল ও যুগোপযোগী গবেষণা কর্মকাণ্ডের জন্য সর্বত্র সমাদৃত হয়েছেন। বিনা এ পর্যন্ত ৩১টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা  লাভ করেছে। এর মধ্যে স্বাধীনতা পদক-২০১৯ সহ জাতীয়ভাবে ২২টি এবং আন্তর্জাতিকভাবে ৯টি পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করে। 

বিনার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক শরীফুল হক ভুঁইয়া বাসসকে বলেন, পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের কৃষিতে অনেক পরিবর্তন এনেছে বিনা। এ পর্যন্ত ২২টি ফসলের মোট ১৩৯টি উচ্চফলনশীল ও উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে পারমানবিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ৯৬টি জাত উদ্ভাবন করেছে বিনা।

বিনা’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি এ যাবৎ ধান, পাট, গম, ডাল, তেলবীজ, সব্জি ও মসলা জাতীয় শস্যের ২২ টি ফসলের উচ্চ ফলনশীল এবং উন্নত গুনাবলী সম্পন্ন ১৩৯ টি জাত উদ্ভাবন করেছে। ফসলের উন্নত এ জাতগুলো ছাড়াও ডাল ও শিম জাতীয় তেল ফসলের নাইট্রোজেনের বিকল্প হিসেবে ইনস্টিটিউট থেকে ১০টি জীবাণুসার উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমানে ছোলা, মসুর, চিনাবাদাম, সয়াবিন, মুগ, মাষকলাই, বরবটি ও ধৈঞ্চা’র জীবাণু সার ইনস্টিটিউট থেকে তৈরি এবং সরবরাহ করা হচ্ছে। এ সকল জীবাণু সার প্রয়োগে সয়াবিনে ৭৫ থেকে ১৫০ ভাগ এবং ডাল ও শিম জাতীয় শস্যে ২০ থেকে ৪৫ ভাগ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়। জীবাণু সার প্রয়োগ করলে ইউরিয়া সার দেয়ার প্রয়োজন হয় না। ফসফো-ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে মৃত্তিকার স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ফসফেটিক সারসহ অন্যান্য রাসায়নিক সারের সাশ্রয় হয়। এছাড়াও বিনা অদ্যাবধি ৫৭ (সাতান্ন) টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে ।

পারমাণবিক পদ্ধতিতে বিনার প্রধান প্রধান উদ্ভাবন ও সাফল্যের মধ্যে বিনাধান-১৪ উল্লেখযোগ্য। সাধারণত প্রচলিত পদ্ধতিতে ধানের একটি নতুন জাত তৈরি করতে ৮ থেকে ১২ বছর সময় লাগে। কিন্তু বিনা আয়ন বিম প্রযুক্তির সাহায্যে মাত্র ৪ বছরে স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ ফলনশীল জাত বিনাধান-১৪ উদ্ভাবন করেছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মাটি এবং দেশের বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য তারা বিশেষ জাত (যেমন- বিনাধান-১০, বিনাধান-২৩ ইত্যাদি) উদ্ভাবন করেছে। এর ফলে উপকূলের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ভাগ পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে। ধান ছাড়াও তারা বিনা সরিষা, বিনা মুগ, বিনা মসুর, বিনা সয়াবিন, বিনা টমেটো এবং বিনা চিনাবাদামের মতো উচ্চ ফলনশীল ও রোগপ্রতিরোধী জাত তৈরি করেছে।

মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও ক্ষতিকর রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাতে বিনা ১০টি জীবাণু সার উদ্ভাবন করেছে। এই জীবাণু সার ব্যবহারে ডাল ও শিম জাতীয় শস্যের ফলন ২০ থেকে ৪৫ ভাগ এবং সয়াবিনের ফলন ৭৫ থেকে ১৫০ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এটি ব্যবহারে জমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া সার দেয়ার প্রয়োজন হয় না, যা কৃষকের খরচ বাঁচায় এবং পরিবেশ রক্ষা করে। বিনা দেশীয় ফসলের জিনগত বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে জানার জন্য জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে তারা খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, রোগবালাই এবং পোকামাকড় প্রতিরোধী ফসলের জাত তৈরি করছে।

বিনা উদ্ভাবিত ফসলের জাতসমূহের মধ্যে রয়েছে- ধান ২৬ টি’র মধ্যে আউশ জাতের ধান    ২টি, আমন জাতের ধান ১৪টি, বোরো জাতের ধান ১০ টি, গম ১ টি, তেল জাতীয় ফসল ৩৭ টি’র মধ্যে সরিষা    ১২ টি, চিনাবাদাম    ১২ টি, সয়াবিন    ৭ টি, তিল ৬ টি, ডাল জাতীয় ফসল ৪১ টির মধ্যে মসুর    ১২ টি, মুগ ১৩ টি, ছোলা    ১১ টি, মাষ ৩ টি, খেসারী    ২ টি, উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল ২৫ টির মধ্যে টমেটো     ১৩টি, লেবু    ৩টি, পিঁয়াজ    ২টি, মরিচ ২টি, হলুদ ১টি, রসুন ১টি, কুল ১ টি, সফেদা     ১ টি, কালিজিরা ১ টি, আঁশ জাতীয় ফসল ৪ টি, পাট ৪ টি।

এছাড়া বিনা উদ্ভাবিত উল্লেখযোগ্য কিছু প্রযুক্তিসমূহের মধ্যে প্রধান প্রধান শস্য পরিক্রমায় সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, ধান ভিত্তিক শস্য পরিক্রমায় ফসফেট সারের ব্যবস্থাপনা, ধান চাষে নাইট্রোজেন সারের ব্যবস্থাপনা, ফসফেটিক জীবাণু সার, লবণাক্ত জমিতে গম চাষ, মাটিতে দস্তার প্রয়োজনীয়তা নির্ণয়, পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বরেন্দ্র এলাকার জন্য নতুন শস্য পরিক্রমা, আর্সেনিকমুক্ত পানি উত্তোলনের জন্য অগভীর নলকূপ স্থাপন, ধানগাছের মাধ্যমে আর্সেনিক শোষণ, মাটি-উদ্ভিদে আর্সেনিকের স্থানান্তর, লবণাক্ত এলাকায় ফসলের  সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় টমেটো গাছের ঢলে পড়া রোগ দমন, রোগ প্রতিরোধী শস্য জাত উদ্ভাবন ও বিস্তার, মাটির স্বাস্থ্য সেবা, লবণাক্ত এলাকায় সূর্যমুখী, ভূট্টা ও সয়াবিন চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, লবণাক্ত এলাকায় ফারো রোপন পদ্ধতি, লবণাক্ত এলাকায় গম চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, মাল্টার কলম করার কলাকৌশল এবং সফেদার বংশবিস্তার কলাকৌশল অন্যতম।

কৃষি গবেষণায় প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ইনস্টিটিউট ১৯৭৯-৮০ সালের কৃষি উন্নয়নে ‘রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার’ লাভ, কৃষি গবেষণা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮০-৮১ ও ১৯৮১-৮২ সালে ‘রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার’ লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি।

কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে বায়োটেকনোলজি বিভাগ, বিনা ২০১৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় কৃষি পুরষ্কার রৌপ্য পদক লাভ করে। কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১৪ কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় কৃষি পুরস্কার স্বর্ণ পদক লাভ  করে।

এছাড়া কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০১৬’ স্বর্ণ পদক অর্জন করে। কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্বাধীনতা পদক-২০১৯ অর্জন করে ।

ফুড সিকিউরিটিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম (প্রাক্তন মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা) জাতিসংঘের এফএও-আইএইএ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘আউটস্ট্যান্ডিং এচিভমেন্ট’ লাভ করেন । কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিনা ২০১৬ সালে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে ‘আইডিবি প্রাইজ ২০১৬ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি’ পুরষ্কার লাভ করে।

লবণ ও জলমগ্নতা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের স্বীকৃতিসরূপ আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম এবং উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগকে ২০১৮ সালে সম্মাননা প্রদান করে ।

মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামছুন্নাহার বেগম কৃষি গবেষণায় মিউটেশন ব্রিডিং এর স্বীকৃতিসরূপ ২০২১ সালে ওমেন ইন প্ল্যান্ট ব্রিডিং অ্যাওয়ার্ড অফ এফএও-আইএইএ অফ দা ইউনাইটেড ন্যাশনস পুরষ্কার লাভ করে। মিউটেশন ব্রিডিং এর মাধ্যমে ফসলের জাত উদ্ভাবনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিনা ২০২১ সালে ‘আউটস্ট্যান্ডিং এচিভমেন্ট’  অর্জন করে।

বিনা’র মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাহবুবুর রহমান খান প্রতিষ্ঠানটির নানা উদ্ভাবনী সক্ষমতার কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত একটি জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিনা, যার প্রধান কাজ হলো- পারমাণবিক কৌশল ও বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে বিভিন্ন ফসলের উচ্চ ফলনশীল ও প্রতিকূলতা-সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পারমাণবিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে বিনা পৃথিবীর অষ্টম অবস্থানে রয়েছে।




আ.দৈ/এসআর






Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝