আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিক সুমির মৃত্যুর তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ দাবি ব্লাস্টের
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর উপকন্ঠে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় পোশাক কারখানায় কর্মরত অবস্থায় শ্রমিক সুমি আক্তার ওরফে মিশুর (২৭) মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। একই সঙ্গে সংগঠনটি ওই শ্রমিকের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে শ্রমিকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) ব্লাস্টের কমিউনিকেশন বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়। গত ১৬ অক্টোবর বিকেলে আশুলিয়ায় ডেকো গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে কাজ করার সময় মেশিনে বসা অবস্থায় হঠাৎ মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন সুমি। পরে কারখানার মেডিকেল সেন্টারে তার মৃত্যু হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, অসুস্থ বোধ করায় সুমি ছুটি চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও উৎপাদনের চাপের মধ্যে তাকে কাজ করতে হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং অসুস্থ অবস্থায় ছুটি না দেওয়ার অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
ব্লাস্টের মতে, একজন শ্রমিকের কর্মস্থলে এমন মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। জীবিকার তাগিদে কর্মস্থলে যাওয়া একজন মানুষের জন্য অসুস্থ অবস্থায় প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত ছিল, সেই প্রশ্নেরও জবাব প্রয়োজন।
ব্লাস্ট বলেছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী শ্রমিকদের আইনসম্মত কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রযোজ্য স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইন লঙ্ঘন হয়ে থাকলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্লাস্টের চার দফা দাবি:
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সুমির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হবে। অসুস্থ অবস্থায় ছুটি চাওয়ার পরও তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছিল কি না, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করানোর পরিস্থিতি কি ছিল এবং অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনতে হবে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মস্থলের নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। তদন্তে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, দুর্ব্যবহার কিংবা শ্রম আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডসহ পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রম আইন প্রতিপালন, কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘন শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
মারা যাওয়া শ্রমিকের পরিবারকে প্রচলিত শ্রম আইন ও প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দ্রুত দিতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্লাস্টের মতে, কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের মৃত্যু কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো ঘটনা নয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কারখানা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং অসুস্থ হলে ছুটি, জরুরি চিকিৎসা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আইনসম্মত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিটি কারখানায় বাস্তবায়ন করতে হবে। সুমির মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়সংগত প্রতিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই তার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝুঁকি কমানোর পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
আ. দৈ./একে




















