গার্ডিনের নিবন্ধ
অস্থিরতার নতুন যুগে প্রবেশ করেছে উপসাগরীয় অঞ্চল
শাহীন রহমান

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল নতুন এক অস্থিরতার যুগে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিনের মিত্রতা ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতার ওপর নির্ভর করে আর আগের মতো নিরাপদ থাকা সম্ভব নয়। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হুতিদের প্রাণঘাতী হামলা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকট সাময়িক নয়; বরং এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে কলামিস্ট নেসরিন মালিক বলেছেন, গত এক বছরে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যে অবনতি ঘটেছে, তা উপসাগরীয় নেতাদের প্রত্যাশার চেয়েও গভীর। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পুরোনো আঞ্চলিক সমীকরণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রিয়াদে হামলায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
নিবন্ধে বলা হয়েছে, শনিবার সৌদি আরবের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উপসাগরীয় কোনো দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সৌদি আরবের মতো দেশে এত বেশি প্রাণহানির ঘটনা দেশটির নেতৃত্বকে কঠোর পাল্টা পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নেসরিন মালিকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রচলিত ধারণা গত এক বছরে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে। একসময় এসব দেশের নেতৃত্ব মনে করত, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক অংশীদারত্ব তাদের ভূখণ্ড ও জনগণকে বড় ধরনের হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখবে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
কাতারে হামলার পর বদলাতে থাকে পরিস্থিতি
উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের একটি ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালে। এর আগে ইরান কাতারে মার্কিন সেনা অবস্থানরত একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে হামলার আগে সতর্কতা ও সমন্বয়ের কিছু ইঙ্গিত থাকায় সেটিকে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হয়েছিল। কিন্তু একই বছরের শেষ দিকে ইসরায়েল কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা চালায়। হামলায় হামাসের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং পাঁচ ফিলিস্তিনি ও একজন কাতারি নাগরিক নিহত হন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণায় বড় ধাক্কা দেয়। এরপর ২০২৬ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানে হামলা চালায় বলে নিবন্ধে বলা হয়েছে। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। বিমানবন্দর ও আকাশসীমা বন্ধ হওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে যাওয়ায় এসব দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে চাপ তৈরি হয়েছে।
পর্যটন ও বিনিয়োগের স্বপ্নেও আঘাত
উপসাগরীয় দেশগুলো গত কয়েক বছরে নিজেদের আন্তর্জাতিক পর্যটন, ক্রীড়া, বিনোদন ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ফর্মুলা ওয়ান, গলফ, বক্সিংসহ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি সেই পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। বিমান চলাচলে বিঘ্ন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অস্থিরতা আন্তর্জাতিক পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। নিবন্ধের যুক্তি হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সংকটটি শুধু সামরিক নিরাপত্তার নয়; তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সংযোগের ভবিষ্যৎও এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
ইয়েমেনে আবারও শক্তিশালী হচ্ছে হুতিরা
সাম্প্রতিক সংঘাত ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধকেও নতুন করে তীব্র করেছে। ২০১৪ সালে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটিতে সংঘাত শুরু হয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের দখল করা অঞ্চল পুনরুদ্ধারে সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ এই যুদ্ধে লাখো মানুষের মৃত্যু ও ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় ঘটে। ২০২২ সালে সংঘাত কমে এলেও স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। কার্যত দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল হুতি এবং সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়। একই সময়ে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইয়েমেনের পরিস্থিতিতে নতুন পরিবর্তন আসে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের একটি অংশ ইয়েমেনের উপকূলের দিকে সরে যায় বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ নিতে হুতিরা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করে। একই সময়ে ইরানের একটি বিমান অবতরণ ঠেকাতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার সানার বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালায় বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
হুতিরা শুধু ইরানের হাতিয়ার নয়
নেসরিন মালিকের বিশ্লেষণে হুতিদের কেবল ইরানের হয়ে কাজ করা একটি গোষ্ঠী হিসেবে দেখার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ইরানের সমর্থন পেলেও হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য, স্থানীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি রাজপরিবারের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধিতা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিবন্ধে হুতিদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের বেসামরিক অবকাঠামোয় সৌদি হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বকে বার্তা দিতেই শনিবারের আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে গোষ্ঠীটি।
অর্থাৎ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণ করছে। ফলে শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধের অবসান ঘটলেই হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধ মিটে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্লেষকের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আরেকটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা সব পরিস্থিতিতে অগ্রাধিকার পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, গত মাসে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা বাড়ানোর অনুরোধে ট্রাম্প প্রশাসন সাড়া দেয়নি। এর আগে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে হুতিরা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা না করার আশ্বাস দিয়েছিল, তবে সৌদি জাহাজ তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে জানিয়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল সংঘাতের মুখোমুখি হতে হতে পারে। ২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা বলছে, বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও নির্ণায়ক বিজয় অর্জন কঠিন হতে পারে।
পুরোনো মিত্রতা, নতুন অনিশ্চয়তা
গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ, লেবাননে সামরিক অভিযান এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা এবং ইয়েমেনে হুতিদের পুনরুত্থান। নেসরিন মালিকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে পুরোনো মিত্রতার ওপর নির্ভরতা আর আগের মতো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। অন্যদিকে, নতুন করে সক্রিয় হওয়া শত্রুতাগুলো এতটাই ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক যে সেগুলো মোকাবিলা করাও সহজ নয়।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বজায় রাখা। সংঘাতের দ্রুত অবসান না হলে সামরিক ব্যয়, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে ধীরগতির চাপ আরও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখন আর কেবল ইরান ও পশ্চিমা শক্তির দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুর্বল হয়ে পড়া নিরাপত্তা-নিশ্চয়তা এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব স্বার্থ মিলে উপসাগরীয় অঞ্চলকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আ.দৈ/এসআর




















