ইলিশের চলাচল ও প্রজননের মৌসুম কি বদলাচ্ছে!
ভরা মৌসুমে দেখা নেই, নিষেধাজ্ঞার সময় ধরা পড়ছে প্রচুর নিষেধাজ্ঞার সময় নিয়ে হতাশ জেলেরা
শাহীন রহমান

ভরা মৌসুমে নদী ও সাগরে ইলিশের দেখা নেই। জেলেদের জাল ফিরেছে প্রায় খালি হাতে। অথচ সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে হঠাৎ করেই দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগরে ইলিশের ঝাঁক দেখা দিয়েছে। কোথাও বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে প্রচুর, কোথাও বাজারে সরবরাহ বেড়ে দামও কমেছে। আর ঠিক এই সময়েই শুরু হয়েছে ইলিশ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। ফলে জেলেদের প্রশ্ন—যে সময়ে মাছের দেখা মিলল, তখনই কেন বন্ধ হলো মাছ ধরা? এই পালাবদল নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—ইলিশের মৌসুম কি ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে?
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে এ সময়কে ইলিশের নিরাপদ প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এবারের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। প্রচলিত হিসাবে জুন থেকে আগস্টকে ইলিশের ভরা মৌসুম ধরা হলেও আগস্টের শেষ পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগরে প্রত্যাশিত ইলিশ পাওয়া যায়নি। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। পটুয়াখালী, বরিশাল, লক্ষ্মীপুরসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় ইলিশের আহরণ বাড়তে থাকে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে এসব এলাকায় জেলের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে।
লক্ষ্মীপুরের বাজারেও সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইলিশের সরবরাহ বেড়ে যায়। এর ফলে দাম কমে আসায় ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দেয়। গবেষকদের মতে, মৌসুমের শেষভাগে নদীতে ইলিশের ঝাঁক ফিরে আসার ঘটনা জলবায়ু ও নদীর পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে ইলিশের অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে। বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলের জেলের জানিয়েছে দীর্ঘ সময় মাছ না পাওয়ার পর সেপ্টেম্বরেই হঠাৎ বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করেছে। পাথরঘাটা বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগও দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। শেষ সময়ে মাছ উঠলেও নিষেধাজ্ঞা সামনে চলে আসায় জেলেদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
বৃষ্টির সঙ্গে বদলাচ্ছে ইলিশের চলাচল
বিশেষজ্ঞরা বলছেন ইলিশের বিচরণ ও প্রজননের সঙ্গে বৃষ্টিপাত এবং নদীর পানিপ্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে। মৎস্য গবেষক আনিসুর রহমান বলেন দেশের ঋতুচক্রেও পরিবর্তন এসেছে। তাঁর মতে, নব্বইয়ের দশকে আষাঢ়-শ্রাবণে যে ধরনের বৃষ্টি হতো, পরবর্তী সময়ে তার সময় ও ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এখন বর্ষার বড় অংশ আগস্ট-সেপ্টেম্বর, এমনকি অক্টোবরেও গড়াতে দেখা যায়। এর সঙ্গে ইলিশের নদীতে ওঠার সময়ও পরিবর্তিত হতে পারে। শুধু বৃষ্টিই নয়—নদীতে ডুবোচর, দূষণ এবং মোহনা ও নদীতে ছোট ফাঁসের জালের ব্যবহারও ইলিশের চলাচলে বাধা তৈরি করছে বলে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ। ফলে সাগর থেকে নদীতে ইলিশের স্বাভাবিক অভিবাসনের সময় ও পথ দুটিই প্রভাবিত হতে পারে।
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনাতেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবরকে ইলিশের প্রধান প্রজনন সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন নদী ও অঞ্চলে প্রজননের সময় ভিন্ন হতে পারে এবং অন্য সময়েও প্রজনন ঘটে। অর্থাৎ ইলিশের জীবনচক্রকে একটি নির্দিষ্ট দুই-তিন মাসের ক্যালেন্ডারে আটকে দেখার সুযোগ কম। এর সঙ্গে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা যুক্ত হয়েছে—দেশে ইলিশের মোট উৎপাদনও কমছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম। অতিরিক্ত আহরণ, নদী ও সামুদ্রিক আবাসস্থলের ক্ষতি, দূষণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ইলিশের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার সময় নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন এবারের ঘটনাই তাই নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। ৮ থেকে ২৯ অক্টোবরের নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য মা ইলিশকে প্রজননের সুযোগ দেওয়া। প্রজনন সফল হলে পরবর্তী সময়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে। ফলে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। প্রশ্নটি বরং অন্য জায়গায়—জলবায়ু, বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহ ও ইলিশের চলাচলের সময় যদি দীর্ঘমেয়াদে বদলে যায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞার সময়ও কি ভবিষ্যতে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন হবে? এর উত্তর পেতে কয়েক বছরের ধারাবাহিক তথ্য প্রয়োজন। কোন মাসে কত ইলিশ ধরা পড়ছে, কোন সময়ে মা ইলিশ নদীতে ঢুকছে, কখন ডিম ছাড়ছে, নদীর পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা কীভাবে বদলাচ্ছে—এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই প্রকৃত পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যাবে।
এবারের অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ইলিশের পুরোনো ক্যালেন্ডার আর প্রকৃতির নতুন ক্যালেন্ডার এক জায়গায় আছে কি না, তা এখন নতুন করে পরীক্ষা করার সময় এসেছে। ভরা মৌসুমে শূন্য জাল আর মৌসুমের শেষ প্রান্তে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে। আর এর উত্তর শুধু জেলেদের আয় নয়, দেশের জাতীয় মাছটির ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে।
আ.দৈ/এসআর




















