বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
ই-পেপার

বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রথমে লিজ নিয়ে পরে জাল দলিলে ২৩ কোটি টাকার জমির মালিক দাবী
আগ্রাবাদে গণপূর্তের সহায়তায় সরকারি জমি দখল ৮ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৫৯ পিএম  আপডেট: ০৭.১০.২০২৬ ৮:০৪ পিএম  (ভিজিট : ১)
X

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় জাল দলিলের মাধ্যমে প্রায় ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের সুনিদষ্টি অভিযোগে একটি পরিবারের সাত সদস্য ৮জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। 

আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) দুদকের উপ-পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন বাদী হয়ে অভিযুক্ত  ফাতেমা বেগম (৯০), তার চার ছেলে-মেয়ে মো. ফরিদ আহমদ (৫৩), মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদ (৩৯), মোহাম্মদ ফয়েজ আহমদ (৬১), হাসিনা মমতাজ (৬০), রোকেয়া সুলতানা (৫৭), শাহীন সুলতানা (৫০) এবং গণপূর্ত চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও বর্তমানে বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারেকের (৪৬) বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে  ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪০৯/ ৪২০/ ৪৬৭/ ৪৬৮/ ৪৭১/ ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান উঠে এসেছে, কথিত জাল দলিল তৈরি করে সরকারি জমির মালিকানা দাবি, সেই দলিল ব্যবহার করে নামজারি, সরকারি কর্মকর্তার দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং বছরের পর বছর সরকারি সম্পত্তি দখলে রেখে ভাড়া না দেওয়ার অভিযোগের সততা মিলছে।

মামলার বাদী দুদক চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ্ব করা হয়েছে, চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার গোসাইলডাঙ্গা মৌজায় আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার লে-আউট প্ল্যানের ১৬ নম্বর প্লটের ২৪ দশমিক ৯৬ শতক জমির মালিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালের সরকারি মৌজা রেট অনুযায়ী ওই জমির মূল্য ১৭ কোটি ১২ লাখ ৬৩ হাজার ১৪০ টাকা। এর ওপর থাকা ভবনের ভাড়া বাবদ আরও ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮ টাকা পরিশোধ করা হয়নি। ওই জমির মূল্য ও বকেয়া ভাড়াসহ আত্মসাতের পরিমাণ ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৮ টাকা।

এদিকে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসছে, ওই জমিটি ১৯৫৮ সালে মেসার্স এস জে অ্যান্ড জি ফজলে এলাহী লিমিটেডের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ১৯৫৯ সালে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের পর প্রতিষ্ঠানটি পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করলে ১৯৭২ সালে সম্পত্তিটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় ওই পরিত্যক্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়।

কিন্তু ২০০২ সালে কনকর্ড ট্রেডিং কোম্পানির পক্ষে ফরিদ আহমদ ও তার বোন হাসিনা মমতাজ ভবন ও জমিটি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেওয়ার আবেদন করেন। সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক ৩৯ হাজার ৫৩৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে ২০০৩ সালের ৭ জুন তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়। ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ২১ লাখ ৮ হাজার ৩১৬ টাকা ভাড়া দেওয়া হয়।  কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লিজ নবায়ন করা হয়নি। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় লিজ বাতিল করে সম্পত্তি দখলে নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

দুদকের মামলায় বলা হয়েছে, সরকারি সম্পত্তির ওপর দখল বজায় রাখার পাশাপাশি ফাতেমা বেগম পরে ওই জমির মালিকানা দাবি করে একটি কথিত পুরোনো দলিল হাজির করেন। ১৯৭০ সালের ১৯ মে পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৩২৮০ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমিটি কেনার দাবি করেন তিনি। কিন্তু অনুসন্ধানে ওই দলিলের মূল কপি বা সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়া যায়নি। পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসও জানায়, ১৯৭০ সালের রেকর্ডপত্র মুক্তিযুদ্ধের সময় পুড়ে যাওয়ায় ওই দলিলের রেকর্ড তাদের কাছে নেই।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, অভিযুক্ত ফাতেমা বেগম ও মূল লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জমি বিক্রির চুক্তি হয় ১৯৭০ সালের ৩ জুলাই। অথচ তিনি যে দলিলের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দাবি করেছেন, সেটি ১৯ মে ১৯৭০ তারিখের,অর্থাৎ বিক্রয় চুক্তির প্রায় দুই মাস আগের। এ ছাড়া ওই সময়ের দলিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্রে বলপয়েন্ট কলমে স্বাক্ষরের বিষয়টিও দুদকের অনুসন্ধানে সন্দেহজনক হিসেবে উঠে এসেছে।

এই কথিত দলিলকে ভিত্তি করেই ২০১২ সালে সরকারি জমিটি নিজের নামে নামজারির উদ্যোগ নেন ফাতেমা বেগম। এ সময় গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেন। দুদকের অভিযোগ, ফাতেমা বেগমের দেওয়া কথিত দলিলসহ অন্যান্য রেকর্ডপত্র তিনি সত্যায়িত করেন। পরে ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জমিটি নামজারির অনুমতি দেওয়া হয়।

এরপর আগ্রাবাদ ভূমি অফিসে নামজারির আবেদনের পর ২৪ দশমিক ৯৬ শতক জমিটি ফাতেমা বেগমের নামে নামজারি হয়। ২০২০ সালে তিনি হেবা দলিলের মাধ্যমে জমিটি তার চার সন্তান ফয়েজ আহমদ, হাসিনা মমতাজ, রোকেয়া সুলতানা ও শাহীন সুলতানার নামে হস্তান্তর করেন।

মামলায় আরো উল্লেখ করা হয়,ওই সরকারি সম্পত্তিতে তিনতলা ভবন রয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে ফরিদ আহমদের কনকর্ড ট্রেডিং, হাসিনা মমতাজের চিকিৎসাকেন্দ্র এবং ফাহিম আহমেদের আগ্রাবাদ কনভেনশন হল পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের একটি অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছেও ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, সরকারি সম্পত্তি লিজ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার পর লিজ নবায়ন না করে দখল বজায় রাখা, পরে কথিত জাল দলিলের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করা, সরকারি কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে সেই দাবিকে প্রতিষ্ঠা করা এবং শেষ পর্যন্ত জমিটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হেবা করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের পরিমাপ অনুযায়ী ২০০৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকারি হারে ভবনটির ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৪ টাকা। এর মধ্যে ২১ লাখ ৮ হাজার ৩১৬ টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮ টাকা পরিশোধ করা হয়নি।

আ. দৈ./একে


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝