আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হতে চায় বাংলাদেশ, ‘লুফথানসা’র সহযোগিতায় বড় পরিকল্পনা
শাহীন রহমান

বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতকেন্দ্র (এমআরও) গড়ে তোলা এবং দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে জার্মানির শীর্ষস্থানীয় বিমান সংস্থা ‘লুফথানসা’র সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ‘লুফথানসা’র একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকে দেশের এভিয়েশন খাতের উন্নয়ন, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো উঠে আসে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে সরকারের এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশে একটি আধুনিক এমআরও সুবিধা গড়ে তোলা। বর্তমানে দেশে বিমান রক্ষণাবেক্ষণের অনেক কাজের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশে আন্তর্জাতিক মানের এমআরও কেন্দ্র গড়ে উঠলে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিদেশি বিমান সংস্থার উড়োজাহাজও রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়নের জন্য ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগও এগিয়ে নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চারটি এয়ারবাস এ-৩৫০-৯০০ দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এবং ছয়টি এয়ারবাস এ-৩২১এনইও আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের কথা রয়েছে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে বিমানের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জানা গেছে উড়োজাহাজগুলোর সরবরাহের সময় নিয়ে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। প্রাথমিকভাবে দ্রুত সরবরাহের কথা বলা হলেও সর্বশেষ পরিকল্পনায় ২০৩৩ সাল থেকে ধাপে ধাপে উড়োজাহাজগুলো পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহের সময় আরও এগিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, এ পরিকল্পনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্গো পরিবহনেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় সরকার। এছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ-ঝুঁকির কার্গো ও মেইল (এইচআরসিএম) তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জ। ইউরোপমুখী কার্গো পরিবহনে এ ধরনের বিধিনিষেধ কমাতে জার্মানিসহ ইউরোপীয় অংশীদারদের সহযোগিতা চাইছে। ঢাকা ও সিলেট বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা মূল্যায়নে উচ্চ স্কোর পাওয়াকে সরকার ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হতে হলে শুধু নতুন বিমান কেনাই যথেষ্ট নয়। আধুনিক বিমানবন্দর অবকাঠামো, দ্রুত ট্রানজিট সুবিধা, পর্যাপ্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, দক্ষ পাইলট ও প্রকৌশলী, কার্গো অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে আগামী বছরগুলোতে বোয়িং ওয়ান, এয়ারবাস মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে একই সঙ্গে পাইলট, প্রকৌশলী ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়বে। নতুন উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সেগুলো লাভজনকভাবে পরিচালনা এবং পর্যাপ্ত যাত্রী ও কার্গো পরিবহন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন সরকারের বর্তমান উদ্যোগকে শুধু বিমান কেনার প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নতুন উড়োজাহাজ, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, ‘লুফথানসা’র মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা, এমআরও সুবিধা, দক্ষ জনবল এবং কার্গো সক্ষমতা—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে দেশকে একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচলকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের পর্যটন, বাণিজ্য, রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আ.দৈ/এসআর




















