ভাড়াটিয়াদের জীবনধারা
আয়ের অর্ধেকই বাসাভাড়ায়, বাকি জীবন ধারদেনায়
বাসাভাড়া মেটাতে খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসায় কাটছাঁট— ৮২ শতাংশ পরিবারের আবাসন ব্যয় সামর্থ্যসীমার ওপরে
শাহীন রহমান

ঢাকায় থাকার খরচ এখন শুধু মাসিক বাজেটের একটি অংশ নয়; বহু পরিবারের জন্য বাসাভাড়া হয়ে উঠেছে আয়ের সবচেয়ে বড় বোঝা। একদিকে বাড়ছে ভাড়া, অন্যদিকে জীবনযাত্রার অন্যান্য ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ। ফলে মাসের শুরুতেই আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ায়। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে খাবার, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ভাড়াটিয়ারা।
ঢাকার আবাসন পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বড় পরিসরের গবেষণাগুলোর একটি ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের স্টেট অব সিটিস ২০১৭হাউজিং ইন ঢাকা। মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডা ও পুরান ঢাকার ৪০০ পরিবারের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, ৮২ শতাংশ ভাড়াটিয়া পরিবার বাসাভাড়া ও ইউটিলিটি বাবদ আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি ব্যয় করে। আন্তর্জাতিকভাবে আবাসন ব্যয়ের গ্রহণযোগ্য সীমা সাধারণত ৩০ শতাংশের মধ্যে ধরা হয়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৪৪ শতাংশ পরিবারকে বাসাভাড়া ও ইউটিলিটি মিলিয়ে প্রায় অর্ধেক আয় ব্যয় করতে হয়।
গবেষণা অনুযায়ি ঢাকার ভাড়াটিয়া পরিবারের একটি বড় অংশের হাতে মাসিক আয়ের অর্ধেক বা তার কাছাকাছি অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। আবাসন ব্যয়ের ভাষায় এটি তীব্র হাউজিং কস্ট বার্ডেন। আর কোনো পরিবার আয়ের অর্ধেকের বেশি আবাসন ব্যয়ে ব্যয় করলে তাকে সাধারণত সিভিয়ারলি কস্ট বার্ডেনড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৩ সালে বাড্ডা এলাকার ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় মধ্যবিত্ত পরিবারের রেন্ট টু ইনকাম রেসিও ৪৫-৫০ শতাংশ পাওয়া গেছে। গবেষণাটিতে এই পরিস্থিতিকে সিভিয়ারলি কস্ট বার্ডেনড হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত ২০২৫ সালে নায়াটোলা, মগবাজার এলাকার মধ্যবিত্ত ভাড়াটিয়া পরিবার নিয়ে করা গবেষণায় দেখা যায়, ভাড়া ও সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে পরিবারের আয়ের ৩৭ থেকে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। গবেষণাটি বলছে, ভাড়ার এই চাপের কারণে পরিবারগুলো খাবার, গৃহস্থালি প্রয়োজন ও সন্তানের শিক্ষার মতো অন্যান্য ব্যয়ে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজধানীতে ভাড়াটিয়ার সংখ্যা কম নয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্যে বলা হয়েছে, ঢাকা বিভাগে প্রায় ৪৫ শতাংশ পরিবার ভাড়া বা সাবলেটে থাকে, যেখানে জাতীয় গড় ১৯.০৮ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে ২০১৭ সালের ব্রাকের গবেষণার তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, ইউটিলিটিসহ প্রায় ৮২ শতাংশ পরিবারের আবাসন ব্যয় প্রচলিত এ্যাফোর্ডডেবিলিটি সীমার ওপরে ছিল।
শুধু তাই নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রতি বছর ভাড়া বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হাউস রেন্ট ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশের ভাড়া বৃদ্ধির হার ছিল ৫.১৯ শতাংশ; এর আগের দুই প্রান্তিকেও তা ৫ শতাংশের ওপরে ছিল। যদিও এই সূচক জাতীয় পর্যায়ের, ঢাকার ভাড়াটিয়াদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হওয়ার কারণ শহরের উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ও সীমিত সাশ্রয়ী আবাসন। ভাড়াটিয়ার সংকট শুধু ভাড়ার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণা বলছে, ঢাকার আবাসন সংকটের অন্যতম প্রধান বাধা হলো এ্যাফোর্ডডেবিলিটি বা সামর্থ্য। একই সঙ্গে ভাড়াটিয়ার নিরাপত্তা, আনুষ্ঠানিক ভাড়াচুক্তির অভাব এবং বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতাও সমস্যা বাড়াচ্ছে। ফলে একজন ভাড়াটিয়াকে শুধু উচ্চ ভাড়া নয়, বাড়িওয়ালার ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত, অগ্রিম অর্থ, বাসা ছাড়ার অনিশ্চয়তা এবং সীমিত বিকল্প—সবকিছুর সঙ্গে লড়তে হয়।
এ অবস্থায় পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ২০২৬ সালে নতুন বাড়িভাড়া নির্দেশিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত নির্দেশনায় দুই বছরের আগে ভাড়া না বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া সমন্বয়ের মতো বিধান রাখা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভাড়াটিয়ার ওপর আকস্মিক ভাড়া বৃদ্ধির চাপ কমানোর একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন ঢাকায় আবাসন এখন শুধু মাথা গোঁজার জায়গা নয়; বহু পরিবারের মাসিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। আয় বাড়ার তুলনায় ভাড়া ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকলে এই চাপ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাশ্রয়ী ভাড়ার আবাসন, কার্যকর ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, ভাড়াটিয়ার আইনি নিরাপত্তা এবং শহরের বাইরে মানসম্মত কর্মসংস্থান ও আবাসন—এই চারটি বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া ঢাকার ভাড়াটিয়ার জীবনযাত্রার চাপ কমানো কঠিন।
অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী এ বিষয়ে বলেন ভাড়া যখন পরিবারের আয়ের বড় অংশ নিয়ে নেয়, তখন সঞ্চয় ও দৈনন্দিন ভোগের জন্য মানুষের হাতে কম টাকা থাকে। একই সঙ্গে বাসাভাড়া মানুষের কোথায় বসবাস করবে এবং কর্মস্থলে যেতে কত দূর যাতায়াত করবে—সেটাও প্রভাবিত করে। বাড়িভাড়া বাড়ার ফলে শুধু আবাসন ব্যয়ই বাড়ে না; পরিবারের সঞ্চয়, দৈনন্দিন খরচ এবং কর্মস্থল নির্বাচন—সবকিছুর ওপর চাপ পড়ে। গবেষক ড. মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম তার গবেষণায় উল্লেখ করেন, ঢাকার আবাসন সংকট শুধু বাড়িভাড়া বেশি হওয়ার সমস্যা নয়; মানুষের আয় ও আবাসনের দামের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
আ.দৈ/এসআর




















