বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
ই-পেপার

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত, ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৬ পিএম   (ভিজিট : ০)
X

মূল্যস্ফীতির হার সাম্প্রতিক সময়ে কমলেও এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এ কারণে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ডেপুটি গভর্নর জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সিদ্ধান্তের আওতায় স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমলেও ঝুঁকি কাটেনি

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।.কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশঙ্কা করছে, বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য অচলাবস্থা, দেশের নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দাম সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করা হলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ফের বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতিকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে চাপ

মুদ্রানীতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে আসাই সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমার অন্যতম প্রধান কারণ। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমেনি। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নও মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর, কমেছে শিল্প উৎপাদন

মুদ্রানীতিতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এখনো চাপ থাকার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ওই সময়ে শিল্প উৎপাদনও শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন সূচক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনীতিতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উচ্চ সুদের কারণে অর্থায়নের ব্যয়, জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তাকে প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে।

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে বিভিন্ন খাতে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুদ্রানীতিতে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পের কথাও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতির সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশ

সম্প্রতি মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করার পর আর্থিক বাজারে স্বস্তির লক্ষণ দেখা গেছে। গত ২ আগস্ট থেকে নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়। এরপর আন্তঃব্যাংক সুদহার ও সরকারি সিকিউরিটিজের ইল্ডও কমেছে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা এখনো দুর্বল। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিনিয়োগে ধীরগতি, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে এর পেছনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবণতা, লেনদেন ভারসাম্যে চাপ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অর্থবছরে ব্যালান্স অব পেমেন্টসে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে আর্থিক হিসাবের ঘাটতিকে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা সহায়তা মিলেছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অর্থনীতিতে দ্রুত নয়, ধীরগতির পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা

আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিতে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ধীরগতিতে পুনরুদ্ধার হওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে দেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে ভিন্নতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরে ধীরে ধীরে কমতে পারে বলে ধারণা করা হলেও এর গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অর্থনীতিতে একাধিক ঝুঁকি

আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এবং বৈশ্বিকভাবে কঠোর মুদ্রানীতি। দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকেও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই বর্তমানে মুদ্রানীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট ঋণ সহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা এবং বিনিময় হারে সুশৃঙ্খল নমনীয়তা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য ও আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করাই নতুন মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য।





আ.দৈ/এসআর



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
ব্যাংক-বীমা- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝