জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাবের আশঙ্কা
বিশেষ প্রতিনিধি

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে দেশের বাজারে আবারও বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। সোমবার থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দামে ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। দাম কার্যকর হওয়ার প্রথম দিনেই এর প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে। কোথাও বাসভাড়া বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে, কোথাও বাড়তি ভাড়া নেওয়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালক-হেলপারদের বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে। আন্তঃজেলা পরিবহনেও ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পরিবহন খাতে পড়লেও এর পরিধি এখানেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে; আর সেই বাড়তি ব্যয় ধাপে ধাপে উৎপাদন, সরবরাহ ও খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে এর প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
সরকার অবশ্য বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা কাজ করেছে। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয়ও বেড়েছে। এতে আমদানি করা জ্বালানির প্রকৃত ব্যয় বেড়ে যায়। একই সময়ে দেশের জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপ সামলানো এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানোও সরকারের সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।
সরকারের হিসাবে, গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চ মূল্যের কারণে বিপিসির ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম সমন্বয় না করলে সরকারি অর্থায়নের ওপর বাড়তি চাপ পড়ত। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি মূল্যও সে অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের দাম এক ধাপে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব অর্থনীতিতে বহুমুখী হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনের মতে, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প—সব খাতেই ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব পণ্য দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সড়কপথে পরিবহন করতে হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে বাড়তি পরিবহন ব্যয় সরাসরি বাজারদরে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানও পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করছে, তখন জ্বালানি ব্যয়ের এই বৃদ্ধি সেই চাপ আরও বাড়াতে পারে। এর প্রথম ধাক্কা পড়েছে গণপরিবহনে। ঢাকার বিভিন্ন রুটে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর কিছু বাসে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
যদিও ভাড়া পুনর্নিধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া নিয়ে যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের মধ্যে বিরোধের খবর পাওয়া গেছে। এতে একদিকে যাত্রীদের বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা বলছেন, বর্তমান জ্বালানি দামে আগের ভাড়ায় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আন্তঃজেলা পরিবহনেও একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি রুটে বাসমালিকেরা ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। কোথাও কোথাও ৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের যাতায়াত ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহনেও বাড়ছে খরচের চাপ। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মালিকেরা নতুন ভাড়া নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর ফলে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে কৃষিপণ্য, মাছ, সবজি, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্য পৌঁছে দিতে বাড়তি অর্থ লাগতে পারে। বিশেষ করে দূরবর্তী জেলা থেকে রাজধানী ও বড় বাজারে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে এই ব্যয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
কৃষিখাতেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে কৃষক পর্যায়ে বাড়তি খরচ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বাজারে কৃষিপণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্প খাতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। কাঁচামাল পরিবহন, পণ্য সরবরাহ ও বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি পরিচালনায় জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। উদ্যোক্তারা সেই বাড়তি ব্যয় কতটা নিজেদের মধ্যে ধরে রাখবেন আর কতটা পণ্যের দামে যুক্ত করবেন—তা নির্ভর করবে বাজারের প্রতিযোগিতা ও চাহিদার ওপর।
তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কতদিন উঁচু থাকে, দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন থাকে এবং সরকার পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া যেন অনিয়ন্ত্রিতভাবে না বাড়ে, সে বিষয়েও নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও বিপিসির আর্থিক চাপ সামলানোর যুক্তিতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সেই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে পরিবহন ব্যয়ে এবং এর পরবর্তী ধাপে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন—আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামলানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার প্রথম দিনেই পরিবহনে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে—মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পাম্পে জ্বালানি কেনার সময়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে পারে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত বাজারের দামে।
আ.দৈ/আরএস




















