প্রধানমন্ত্রীর খালাতো ভাইয়ের পেট্রোল পাম্পে ডাকাতি, গ্রেফতার-৩
নিজস্ব প্রতিবেদক :

রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খালাতো ভাইয়ের ‘ডিএল ফিলিং স্টেশনের’ ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনায় চক্রের মূলহোতা জলিল মোল্লাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।
আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র ও উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী এসব তথ্য জানান। র্যাব জানায়, চক্রটি ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সংগ্রহের সময় অর্থ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে। পরে চক্রের এক সদস্যের নজরদারির মাধ্যমে দেওয়া তথ্যে ডাকাতির ঘটনা ঘটায় চক্রটি।
তিনি বলেন, গত ৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ডিএল ফিলিং স্টেশন থেকে ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার উদ্দেশ্যে লাল রঙের ছোট কাভার্ড ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার সময় সশস্ত্র ডাকাত দল পথরোধ করে এবং অর্থ লুট করে নিয়ে যায়।
ঘটনার পর র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারিতে এই সংঘবদ্ধ ডাকাতির নেপথ্যে তথ্য বেরিয়ে আসে। ডাকাত দলের সদস্য কাউসার গাড়িতে তেল উত্তোলনের কাজে ডিএল ফিলিং স্টেশনে আসা-যাওয়ার সুবাদে সাপ্তাহিক একটি বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংকের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে পারে। সে জানতে পারে ওই ফিলিং স্টেশনে যারা কাজ করে, তাদেরই এক কর্মীর মাধ্যমে।
পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি জানান, পূর্বে কুমিল্লায় একটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির মামলায় জেলে থাকাকালীন ১৮টি মামলার আসামি ডাকাত হাকিমের সঙ্গে কাউসারের পরিচয় হয়। হাকিম এই সময় জেলে থাকার কারণে তারা অপেক্ষা করতে থাকে। পরে হাকিম ডাকাত জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরে তারা ডাকাতির পুরো পরিকল্পনাটা তৈরি করে। ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ আগে, অর্থাৎ ২ আগস্ট মূল পরিকল্পনাকারী হাকিম, তথ্য প্রদানকারী কাউসার এবং এই ডাকাতি বাস্তবায়নকারী জলিল মোল্লা একসঙ্গে ডিএল ফিলিং স্টেশনে যায় এবং পুরো এলাকাটি নিখুঁতভাবে রেকি করে।
মাঠ পর্যায়ে এই ডাকাতি বাস্তবায়নের জন্য হাকিম ও কাউসার ছাড়াও সাতজন ডাকাত, যাদের মধ্যে ছয়জন তিনটি মোটরসাইকেলে সরাসরি ডাকাতিতে অংশগ্রহণ করে এবং ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি একজন তথ্যদাতা হিসেবে উপস্থিত থাকে।
মুস্তাফিজ নামে এই ব্যক্তি, যে তথ্যদাতা ছিলেন, ওই ফিলিং স্টেশনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি তার মোবাইলের মাধ্যমে ছোট লাল রঙের কাভার্ড ভ্যানে করে টাকা নিয়ে ফিলিং স্টেশন থেকে গাড়ি রওয়ানা দিয়ে দেওয়ার এই তথ্যটি ডাকাত দলকে জানিয়ে দেয়।
পরে টাকা বহনকারী কাভার্ড ভ্যান রাজধানীর বিমানবন্দর থানার ক্রাউন প্লাজার সামনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ডাকাত দল তিনটি মোটরসাইকেলে করে গতিরোধ করে এবং তাদের কাছে থাকা অর্থ ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় ডাকাত দল ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ডাকাতি করে। ডাকাতির পর তারা নিজেদের মধ্যে এই টাকাগুলো ভাগ করে নেয়। মূলহোতা জলিল মোল্লা আনুমানিক ৫৩ লাখ টাকা তার কাছে রাখে। ডাকাতির সময় যে মোটরসাইকেলে ছিল এবং তার হাতে একটি পিস্তল ছিল। তার আরেকজন সহযোগী ছিল সাগর বড়াই। সে আনুমানিক ১৪ লাখ টাকা ভাগে নেয় এবং ডাকাতির সময় তার হাতেও পিস্তল ছিল। এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন এবং তার কাছ থেকে আনুমানিক ১২ লাখ টাকা সে সময় উদ্ধার করা হয়।
অন্য সহযোগী ছিল মুস্তাফিজ, যে তথ্যদাতা হিসেবে পাশে উপস্থিত ছিল। তার কাছে আনুমানিক ১৪ লাখ টাকা ছিল। শফকত হোসেন দিপু আনুমানিক ১০ লাখ টাকা পেয়েছে। সোহেল আনুমানিক ১০ লাখ টাকা পেয়েছে। আলী, ওই ডাকাতির সময় যার হাতে চাপাতি ছিল, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, সে আনুমানিক এই ডাকাতির ভাগ হিসেবে ১০ লাখ টাকা পেয়েছে। শওকত হোসেন দিপু আরেকজন অজ্ঞাত সহযোগীকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। সে আনুমানিক ১০ লাখ টাকা এই ডাকাতির ভাগে পেয়েছে।
কাজ গোছানোর জন্য সোর্স হাকিম এবং কাউসারের টাকার ভাগাভাগি জলিলের কাছে রাখা ছিল। হাকিম এবং কাউসারের যে টাকার ভাগ, এটা আসলে জলিল আত্মগোপনে চলে যাওয়ার কারণে তাকে আর পৌঁছে দিতে পারেনি বলেও জানান র্যাবের মুখপাত্র। অর্থ সংক্রান্ত তথ্যগুলো আমরা জলিলের কাছ থেকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পেয়েছি। পরে বিস্তারিত তথ্য পরিপূর্ণ তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে।
ইন্তেখাব চৌধুরী আরও বলেন, ডাকাতির তদন্ত চলাকালীন আগের দুটি মামলার অধিযাচনের ভিত্তিতে মূল পরিকল্পনাকারী হাকিম ডাকাতকে গত ১৬ আগস্ট দিবাগত রাতে গ্রেফতার করা হয়। তার বাসা থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড গুলি, পুলিশের ব্যবহৃত দুটি হ্যান্ডকাফ এবং একটি ওয়্যারলেস সেট উদ্ধার করা হয়।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৭ আগস্ট সকালে উত্তরা থেকে কাউসারকে গ্রেফতার করা হয়। হাকিমের তথ্যের সূত্র ধরে র্যাবের গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। অবশেষে ১৮ আগস্ট দিবাগত রাতে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই এলাকা থেকে র্যাবের একটি বিশেষ আভিযানিক দল ডাকাত জলিলকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। জলিলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়ার চারভাগ মধ্যপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৩ লাখ টাকার মধ্যে ৪৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য জানিয়ে র্যাবের মুখপাত্র বলেন, ডাকাতির বিষয় জলিল স্বীকার করেছে। প্রায় আড়াই মাস আগে মতিঝিলে সংঘটিত ১৭ লাখ টাকার একটি ডলার ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনায়ও সে এবং তার চক্র জড়িত ছিল। একটি ক্লুলেস অবস্থা থেকে শুরু করে পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীসহ গ্রেফতারের মাধ্যমে এই ৪৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। চক্রের অন্যান্য পলাতক সদস্য এবং অবশিষ্ট টাকা উদ্ধারে র্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও জানান, রাজধানীর তুরাগ থানার কামারপাড়া ফলের আড়তে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ফল কেনাবেচা হয়। আড়তে যারা ক্রয়-বিক্রয় করেন, তাদেরও ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়।
আ. দৈ./একে




















