রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভাগিনার পরিণতিতে মামার দীর্ঘশ্বাস
নানা বাড়ির ‘পাগলা ইমুন্ন্যা থেকে ডেভিড ইমন
আজগর আলী, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ৬:৪১ পিএম  আপডেট: ৩০.০৭.২০২৬ ৬:৪৫ পিএম  (ভিজিট : ৯১)
X

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের একটি কৃষক পরিবারে জন্ম ইমনের। বাবা মো. মুসা। পেশায় কৃষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট ছিল ইমনের নেশা।

তার নানা বাড়ী ফটিকছড়ি পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের উত্তর ধুরুং কাশেম ডাক্টারের বাড়ি। নানা বাড়ির স্থানীয় ইমাম আবু হানিফা মাদ্রাসা মাঠে অনুশীলন করতে এসে মাদরাসা শিক্ষকদের বকা শুনা পাগলা ইমন্ন্যা। সে সময় ইমনকে শান্ত-স্বভাবের, বোকাসোকা, ক্রিকেটপাগলা হিসেবে সবাই জানত।

কিন্ত সময়ের ব্যবধানে সেই মোবারক হোসেন ইমন, যিনি ডেভিড ইমন নামেও পরিচিত, এখন আলোচনায় একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে।

মামার ভাষ্য, অত্যন্ত দুঃখজনক! সম্পর্কের ভাগিনা—একসময় যে ছিল সম্ভাবনাময় একজন ক্রিকেটার, আজ তার এমন পরিণতি সত্যিই কষ্ট দেয়।

ছোটবেলা থেকেই তার ক্রিকেটের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। তার স্বপ্ন পূরণের জন্য বাবা-মা তাকে শহরে পাঠিয়েছিলেন, যাতে সে ক্রিকেটে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। শুরুটাও ছিল আশাব্যঞ্জক। পরে শুনেছিলাম, সে তৎকালীন চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের গ্রুপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছিল। হয়তো সেই সূত্রে ক্রিকেটে আরো এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল।

এরপর তাকে ফটিকছড়ির তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু তৈয়বের সঙ্গেও চলাফেরা করতে দেখা যায়।

৫ আগস্টের আগেই তার বাবার শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে ওমানে পাঠানো হয়। তখন তার মা আমাকে ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন, যেন আমি তার জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করি এবং তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে সঠিক পথে চলার পরামর্শ দিই।

আমি তাকে ডেকে অনেক বুঝিয়েছি, ভালো-মন্দ বোঝানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন নিয়ে কঠোরভাবে সতর্কও করেছি। এমনকি তার জন্য Ooredoo-তে একটি চাকরির ব্যবস্থাও করেছিলাম। কিন্ত সে আমার কথা না শুনে দেশে ফিরে যায়। এরপর সময়ের পরিক্রমায় আজ তার এই পরিণতি।

ফটিকছড়ি পৌরসভার আবু হানিফা মাদ্রাসার এক সাবেক শিক্ষক বলেন, ইমন মাঝে-মধ্যেই আমাদের মাদ্রাসা মাঠে ক্রিকেট অনুশীলন করত। তখন তাকে শান্ত-স্বভাবের, ভদ্র ও ক্রিকেটপাগল এক তরুণ হিসেবেই আমরা চিনতাম।একবার গভীর রাতে মাদ্রাসার পুকুরপাড়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কারণে তাকে বকাঝকাও করেছি। তখনও ভাবিনি, ছেলেটির জীবন একসময় এমন মোড় নেবে।

তার সম্পর্কে নানীরা বলেন, ইমন্ন্যা দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড়।আমরা জানি ইমন্ন্যা শহরে ব্যবসা করে অনেক টাকা ইনকাম করে,গত কয়েক মাস ধরে শুনি পাগলা পার্টি করে, গতকাল শুনি পাগলকে পুলিশে ধরছে। সব দোষ হাসন্নির (শেখ হাসিনা)'র ছেলা তৈয়্যুবের,তার কারণে বোকাসোকা এ ছেলেটার জীবন নষ্ট হয়েছে। আবু তৈয়্যুব  গ্রুপের ছেলেদের সাথে ইমন্ন্যার বেশাবেশি আড্ডা ছিলো।

তার এরাকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য জানা যায়,  ক্রিকেটে বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালের দিকে তিনি চট্টগ্রাম শহরের ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন। নিয়মিত অনুশীলন করতেন বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউরী এলাকায়।
বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ বোলিংয়ের কারণে দ্রুত নজর কাড়েন। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবকে অনুসরণ করতেন তিনি। তার একান্ত পরিচিত কয়েকজন ভাষ্য, ধারাবাহিকভাবে অনুশীলনের সুযোগ পেলে বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সামর্থ্য ছিল তার।

কিন্ত কাঞ্চনপুরের তার এলাকাবাসী জানান, ইমন ছেলেটা স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক আর্থিক সংকট। বাবার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, পরিবারের দায়িত্ব এবং ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় বহন করতে না পারায় ধীরে ধীরে মাঠ থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন ইমন এবং এলাকাবাসীসহ আত্মীয় স্বজন সবার থেকে দূরে সরে যায়।

আত্মীয় স্বজনদের  কয়েকজনের ভাষ্য, শেখ হাসিনার পতনের পরে থেকে তার চলাফেরায় পরিবর্তন আসে।এলাকায় তেমন আসতো না,কারো সাথে যোগাযোগ করত না, সবাই জানতো সে পার্টি করে,এর বাহিরে কিছু জানা ছিলো না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবারের একাধিক সদস্যরা জানান, ইমনকে পরিবারের উদ্যোগে ওমানে পাঠানো হয়েছে এবং ভালো একটি চাকরির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কিন্ত সেখানে স্থায়ী না হয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

তাদের ভাষ্য, অনেক বুঝিয়েছিলাম।ভালোভাবে জীবন গড়তে বলেছিলাম। তার ছোট একটা ভাই এখনো লেখা পড়া করে, অবিবাহিত একজন বোনও রয়েছে তার কিন্ত শেষ পর্যন্ত সে সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি। আজকের পরিস্থিতি আমাদের পরিবারের জন্যও বেদনাদায়ক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে ডেভিড ইমনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে।পরবর্তীতে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি এবং অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় তদন্তের সূত্র ধরে যশোরে অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশের দাবি, তিনি সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে।
স্থানীয়দের অনেকে মনে করেন, ইমনের জীবনের এই পরিবর্তন শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

তাদের মতে, আর্থিক অনিশ্চয়তা, খেলাধুলায় পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, ভুল সঙ্গ এবং দ্রুত অর্থ বা প্রভাব অর্জনের আকাঙ্ক্ষা—এসব কারণে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ বিপথে চলে যেতে পারে।

ফটিকছড়ি থানার ওসি রবিউল আলম খান বলেন, গতকাল তার অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, সে ফটিকছড়ি থানায় ওয়ারেন্ট ভুক্ত হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার পালাতক আসামি।

আ. দৈ./কাশেম


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অপরাধ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝