৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে,২৭টি ওয়ার্ড মারাত্মক
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নগরবাসীর সহযোগিতা চাইলেন ডিএসসিসি প্রশাসক
নিজস্ব প্রতিবেদক :

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেরই এডিস মশার জীবানুবাহি ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ৬৩টি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব নির্দিষ্ট সূচকের চেয়ে অনেক বেশি এবং ডেঙ্গু রোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। এরমধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি এবং মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ডিএসসিসির নগরভবনে প্রশাসক আবদুস সালাম মশার লার্ভার ঘনত্ব নিয়ে তৈরি করা জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ডিএসসিসি এলাকায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বিস্তার রোধে করা এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ১২ মে থেকে ২৩ মে পর্যন্ত মোট ১২ দিন এ জরিপ পরিচালিত হয়।
জরিপের ফলাফলে বলা হয়, পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৩৮টি বাড়ির মধ্যে ২৮১টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা (লার্ভার পরের স্তর) পাওয়া গেছে। তার মধ্যে বহুতল ভবনে ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, স্বতন্ত্র বাড়িতে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নির্মাণাধীন বাড়িতে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সেমিপাকা বাড়িতে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া যায়।
ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়িকে নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ দৈবচয়ন ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিচালিত এই ১২ দিনব্যাপী জরিপে ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার মোট ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নেন।
ডিএসসিসির জনসংযোগ বিভাগ জানায়, ডাটা সংগ্রহের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে আধুনিক ‘কবো টুলবক্স' ব্যবহৃত হয়। জরিপ শেষে ব্ৰেটো ইনডেক্স, হাউজ ইনডেক্স, কনটেইনার ইনডেক্স এবং পিউপা ইনডেক্স এর মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যা ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট' চিহ্নিত করা হয়।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে প্লাস্টিকের ড্রামে ৮.৮৯ শতাংশ, মেঝেতে জমানো পানিতে ১২.২৬ শতাংশ এবং বালতিতে জমানো পানিতে ১০.৩৪ শতাংশ চিহ্নিত হয়েছে।
জরিপের সারসংক্ষেপ ও লার্ভার উৎস:
ডিএসসিসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন কর্মীর মাধ্যমে গত ১২ মে থেকে ২৩ মে পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালিত হয়। আধুনিক 'কবো টুলবক্স' (KoboToolbox) প্রযুক্তির মাধ্যমে ২ হাজার ২৫০ টি বাড়ি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
লার্ভার উপস্থিতি: পরিদর্শনকৃত বাড়ির মধ্যে ২৮১টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। স্থাপনার ধরন: বহুতল ভবনে সর্বোচ্চ ৩৫.২৩%, স্বতন্ত্র বা একক বাড়িতে ২৭.৭৬%, নির্মাণাধীন ভবনে ১৭.৪৪% এবং সেমিপাকা বাড়িতে ১৪.৫৯% লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।
পানির উৎস: মেঝেতে জমে থাকা পানিতে ১২.২৬%, বালতিতে ১০.৩৪% এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ৮.৮৯% এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র পাওয়া গেছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, এই জরিপের ওপর ভিত্তি করে আগামী ৭ জুন থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ে ৫ দিনব্যাপী 'বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম' চালানো হবে। পরবর্তী সপ্তাহে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ৩৬টি ওয়ার্ডেও একই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
এছাড়া, আগামী ৬ জুন ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর থেকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে একটি সচেতনতামূলক র্যালির আয়োজন করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে অন্যান্য এলাকাতেও পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, "শুধু সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাসাবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখা এবং প্রতি ৩দিন অন্তর জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।" জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সঠিক তথ্য প্রচারের জন্য তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
ডিএসসিসিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয় বরং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত একদিন জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি।
এ প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদকর্মীদের সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রত্যাশিত। নগরবাসীর সহযোগিতা, গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি ডেঙ্গুমুক্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।
আ. দৈ. / কাশেম




















