অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ‘একলা চলার’ নতুন কৌশল
চতুর্মুখী সংকটে জাতীয় পার্টি
নিজস্ব প্রতিবেদক

নেতাকর্মীদের মাঝে চরম আতঙ্ক, দফায় দফায় হামলা-মামলা, অভ্যন্তরীণ তীব্র বিভক্তি আর তীব্র অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। বিগত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে ক্রমাগত চাপের মুখে থাকা সংসদের সাবেক এই প্রধান বিরোধী দলটি এখন রাজনৈতিকভাবে প্রায় ‘একাকী’ হয়ে পড়েছে।
তবে এই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে রাজনীতিতে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে দলটি। আর সেজন্যই এবার পুরোনো মিত্রদের হিসেব চুকিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব শক্তিতে ‘একলা চলার’ এক নতুন রাজনৈতিক কৌশল হাতে নিয়েছে জাপা।
দলীয় সূত্রমতে, নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা জানান দিতে জাতীয় পার্টি এখন সাংগঠনিক পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতারা খুব শীঘ্রই বিভাগীয় পর্যায়ে সফরে বের হবেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার পর একটি বড়সড় বর্ধিত সভা ডেকে চূড়ান্ত করা হবে আগামী দিনের পথচলার রূপরেখা। কেবল ঘরোয়া রাজনীতিই নয়, জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে মাঠের কর্মসূচিতে থাকা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে দলের হাইকমান্ড।
সম্প্রতি রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের আনাগোনা ও ভিড় কিছুটা বাড়তে দেখা গেছে। তবে এই উপস্থিতির ভেতরেও স্পষ্ট লক্ষ্য করা গেছে এক অজানা আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার ছাপ। দলের একাধিক নেতা জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর বারবার মব-সন্ত্রাস চালানো হয়েছে।
এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও কোনো সংলাপে জাপা-কে ডাকেনি। তাছাড়া বিগত নির্বাচনের মাঠে দলের প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং ষড়যন্ত্র করে হেভিওয়েট প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়ার একটি বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তৃণমূল পর্যন্ত। ফলে কর্মীদের মনে এখন তীব্র ভয় কাজ করছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, নতুন কর্মসূচির ডাক দেওয়া হলেও গ্রেফতার বা হামলার ভয়ে আশানুরূপ জমায়েত নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দলের অনেকেই মনে করছেন, জাপা এখন পুরোপুরি রাজনৈতিক বন্ধুহীন।
জাতীয় পার্টির ভেতরের আরেকটি বড় ক্ষত হলো এর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও তীব্র ভাঙন। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ মহলের ইন্ধনে দল ভেঙে নতুন উপদলের সৃষ্টি হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ব্যারিস্টার আনিস ও এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার। দলের একজন নেতার দাবি, জাতীয় পার্টি বর্তমানে ভেতরে ভেতরে কার্যত ৯টি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
একই সাথে দলে দেখা দিয়েছে চরম অর্থনৈতিক সংকট। নেতারা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে যারা দলটিকে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন, সুদিনের সেই সুবিধাবাদীদের একটি বড় অংশই এখন দল ছেড়ে পালাচ্ছেন। ফলে দল পরিচালনায় বড় ধরনের আর্থিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেও কিছুটা আশার আলো দেখছেন কেউ কেউ। দলছুট নেতাদের অনেকেই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আবার দলে ফিরে আসার যোগাযোগ শুরু করেছেন, যা নিয়ে বর্তমানে নীতিপ্রোৎসাহী মহলে আলোচনা চলছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দলটিকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। যদিও আওয়ামী আমলেও দলটি বারবার ভাঙনের মুখে পড়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জাপা নেতাকর্মীদের দাবি, রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই তাদের বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে এই পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে জাপা নেতারা যুক্তি দেন, ২০১৪ সালে দলের তৎকালীন চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে কার্যত বন্দি করে নির্বাচনে বাধ্য করা হয়েছিল।
এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ দেশের সব দলই অংশ নিয়েছিল এবং তারা প্রায় সাড়ে চার বছর সংসদে ছিল। অথচ ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি সংসদে ছিল মাত্র সাত মাস। জাপা নেতাদের দাবি, তারা বিগত দিনে সংসদে থাকলেও মূলত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন এবং এখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন।
আ.দৈ/আরএস/এ এইচ এইচ




















