জনবান্ধব ও সংস্কারমূলক বাজেটের দাবি জামায়াতের মতবিনিময় সভায়
নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় বাজেটের মূল উদ্দেশ্য সম্পদ পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। কিন্তু সেই বাজেট যেন সাধারণ মানুষকে শোষণের হাতিয়ার বা অর্থপাচারের বন্দোবস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
স্বাধীনতার পর থেকে বিগত বছরগুলোতে দেশের বাজেট জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারেনি। এবার গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি সংস্কারমূলক, জনবান্ধব, বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাজেট প্রণয়ন জরুরি।
রোববার (২৪ মে) রাজধানীর বিজয়নগর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে অর্থনৈতিক বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভার বিষয় ছিল: ‘জাতীয় বাজেট ভাবনা’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন প্রফেসর ড. এ কে এম ওয়াসরেসুল করিম।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সংসদে এবার বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিকল্প বাজেট দেবে জামায়াত। এরই অংশ হিসেবে বাজেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকারের বাজেট এবং দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে অন্তর্নিহিতভাবে আরেকটু মজবুত ও শক্তিশালী করার কাজে সাহায্য করতে চাই।”
তিনি জানান, জামায়াত ইতোমধ্যে ৭-৮টি প্রাক-বাজেট আলোচনার আয়োজন করেছে। এসব আলোচনা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো সংক্ষিপ্ত করে দলের পার্লামেন্টারি পার্টির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, বিরোধী দল হিসেবে সংসদে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা কঠিন। তা সত্ত্বেও আমাদের এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আমরা কেমন বাজেট চিন্তা করি, সেটি জাতির জানা উচিত। সে লক্ষ্যেই আমরা বাজেটে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে চাই।”
সভায় সভাপতির বক্তব্যে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম নির্বাচিত সরকার এই বাজেট উত্থাপন করতে যাচ্ছে। ফলে দেশের মানুষ এই বাজেটে জুলাই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে চায়। ঋণনির্ভরতা কাটিয়ে দেশের মানুষের ওপর বাড়তি করের বোঝা না চাপিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাজেট তৈরির তাগিদ দেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে ড. এ কে এম ওয়াসরেসুল করিম বলেন, আগামী বাজেটে যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই আসবে প্রত্যক্ষ করের (ভ্যাট) মাধ্যমে। এই টাকা গরিব ও মধ্যবিত্তের পকেট থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি দেওয়া হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা রাজস্ব আদায়ে কোনো সৃষ্টিশীল বা বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে চান না। তারা প্রথাগত উৎসের বাইরে গিয়ে কষ্ট করতে চান না বলেই সহজ মাধ্যম হিসেবে ভ্যাটকেই আয়ের প্রধান উৎস বানাচ্ছেন।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “করের হার বাড়ানো কোনো বাহাদুরি নয়। এটি সবাই পারে। কিন্তু করের আওতা বাড়াতে দক্ষতা লাগে। যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়ে যারা কর ফাঁকি দিচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে আদায় নিশ্চিত করুন।” তার মতে, বড় বাজেটের চেয়ে একটি ছোট কিন্তু কোয়ালিটিফুল (গুণগত মানসম্পন্ন) বাজেটই এই মুহূর্তে দেশের মানুষের বড় প্রত্যাশা।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, “আমলারা যেভাবে বাজেট প্রণয়ন করেন, তাতে কেবল তাদের চিন্তাভাবনার প্রতিফলনই দেখা যায়। সেখানে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ থাকে না। আমাদের ট্র্যাডিশনাল বাজেট ভাবনা থেকে বের হওয়ার পথ দেখাতে হবে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে বাজেটের আকার বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি ও অপচয় বাড়বে। এতে প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।”
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও আলোচনা করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান, ডেইলি স্টারের ডেপুটি এডিটর অরুণ দেবনাথ, এসএটিভির বার্তা সম্পাদক সালাহ উদ্দিন বাবলু, আউটলুক বাংলার প্রধান সম্পাদক লুৎফুল কবির সাদী, বাংলাদেশ পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সদরুল হাসান এবং ইআরএফের সাবেক সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মীরধা প্রমুখ।
আ.দৈ/আরএস




















