রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে অ্যাপ
লাভের আশায় জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ
কমিশন পাচ্ছে দেশীয় এজেন্টরা
ইসমাঈল হুসাইন ইমু
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ৮:৪৭ পিএম   (ভিজিট : ৫৯)
X

কমলাপুর রেলস্টেশনে কুলির কাজ করেন সাব্বির (২২)। দিনভর ভারি বোঝা টেনে ক্লান্ত। রাত ৯টার দিকে তার বিশ্রাম নেয়ার পালা।পার্সেল শাখার বারান্দায় ছোট বাক্সের সামনেই তার শোবার জায়গা। এবার শুরু মোবাইল নিয়ে ভিডিও দেখা। না কোন বিনোদন ভিডিও সে দেখছেনা।

 একটি অনলাইন জুয়ার অ্যাপস নামিয়ে কিছু টাকা বিকাশ থেকে পেমেন্ট করে খেলায় মেতেছে। কিছু টাকা আসছে আবার খোয়াও যাচ্ছে| চলছে দীর্ঘ সময়, আবারো পেমেন্ট করে খেলা শুরু। এভাবে প্রতিদিন সাব্বির জুয়া খেলে কিছু না কিছু আয় করছে| মাঝেমধ্যে খোয়াও যাচ্ছে টাকা| তবে বেশি টাকা পাবার আশায় প্রতিদিনই এই জুয়ায় মাতছে সে।

শুধু সাব্বির নয় সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ এই অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। এই সর্বনাশা জুয়ায় কত লোক পথে বসেছে, কত লোক নিঃস্ব হয়েছে এর সরকারি কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন অনুসন্ধান এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লক্ষাধিক মানুষ জুয়ায় হেরে সর্ব হয়েছেন। এই জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হারিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছেস্বাস্থ্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) মানুষ অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এদের সিংহভাগই তরুণ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং বেকার যুবক| ২০২০ সালে করোনা মহামারির লকডাউনের সময় মানুষ যখন ঘরে অবরুদ্ধ, সে সময়ে বৃদ্ধি পায় স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার| এই অবসরে অনলাইন জুয়া ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

মাানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংস্থাগুলোর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৩০% তীব্র মানসিক অবসাদ ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন। অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে আইন ও পুলিশের ভূমিকা অপ্রতুল। এ পর্যন্ত ২ হাজার ৬০০-এর বেশি জুয়ার সাইট এবং অসংখ্য মোবাইল অ্যাপ ব্লক হলেও বন্ধ হয়নি জুয়া। একশ্রেণির মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে জুয়ায় জড়াচ্ছে। তারা বিকাশ-নগদের লেনদেনের মাধ্যমে ˆতরি করেছে ভয়ংকর অনলাইন বেটিং সিন্ডিকেট। কিশোর থেকে বৃদ্ধ বয়সি অনেক মানুষ জড়িয়ে পড়ছে এই ভয়ংকর নেশায়। এ থেকে বাদ থাকছে না স্কুলের শিক্ষার্থীরাও| এতে কেউ হারাচ্ছেন ব্যবসার মূলধন, কেউ বসতভিটা, কেউ সর্বস্ব হারিয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। অভিযোগ রয়েছে, অনলাইন জুয়া শুধু মানুষকেই সর্বস্বান্ত করছে না, এর মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। আর এসব জুয়ার সাইটে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে নামি দামি খেলোয়াড়, সমাজের বিভিন্ন পেশার পরিচিত মুখ, চলচ্চিত্র অভিনেতা অভিনেত্রীদের| আকর্সণীয় বিজ্ঞাপণ দেখে আকৃষ্ট হচ্ছে মানুষ।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাত্র একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যে কেউ জুয়ার জগতে প্রবেশ করতে পারছে| অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হওয়া মাহবুব নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, আগে ডলার দিয়ে খেলতে হতো, তাই লোক কম ছিল| এখন বিকাশে টাকা পাঠালেই খেলা যায়| সহজ হওয়ার কারণেই লোভে পড়ে সবাই জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে।

ঢাকার একটি কর্পোরেট হাউজে চাকরি করতেন আব্দুল্লাহ নামের এক যুবক| তিনি জানান, অনলাইন জুয়ায় তিনি চার লাখ টাকা পর্যন্ত জিতেছিলেন। কিন্তু সে টাকা খোয়াতে বেশি সময় লাগেনি। তিনি যে টাকা জিতেছিলেন তা ছিল টোপ মাত্র| এরপর যতবার খেলেছেন ততবারই টাকা খুইয়েছেন তিনি। কলিগদের কাছ থেকে টাকা ধার করে জুয়ায় বিনিয়োগ করে বিপুল অংকের টাকা দেনায় পড়ে যান। বিষয়টি অফিসের সহকর্মীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে এক পর্যায়ে তার চাকরিটাও চলে যায়| শুধু আব্দুল্লাহই নয় এমন আরো অসংখ্য তরুণ-যুবকরা টাকা ধার করে অনলাইন বেটিং করে  নিঃস্ব হয়েছেন।

পুুলিশ কর্মকর্তার বলছেন, অনলাইন অপরাধ দমনে সব থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে চান না। অনলাইন জুয়ার কারণে চুরি, ছিনতাই, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক কলহ বাড়ছে। অনেক তরুণ জুয়ার টাকা জোগাতে স্বর্ণালংকারবিক্রি, পরিবারের টাকা আত্মসাৎ এমনকি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে। একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলে। পরে বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে| অনেকেই বের হতে চাইলেও পারেন না।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনলাইন জুয়ার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী এজেন্ট সিন্ডিকেট| মাস্টার এজেন্ট, সাব-এজেন্ট ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পুরো নেটওয়ার্ক।খেলোয়াড় হারলে কমিশন পান এজেন্টরা| দেশের বিভিন্ন জেলায় বসে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, অধিকাংশ বেটিং সার্ভার বিদেশে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে| সীমান্তবর্তী জেলা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশি এমন এলাকাগুলোতে এ নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয়। ভয়ংকর এই জুয়ার নেটওয়ার্কের বড় শক্তি হলো সহজ প্রযুক্তি ও মোবাইল ব্যাংকিং। বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে। একাধিক এমএফএস এজেন্ট জানিয়েছেন, অনেক গ্রাহক দিনে কয়েকবার বড় অঙ্কের টাকা ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট করছেন, যা অনলাইন জুয়ার সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট বলে তাদের ধারণা| সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে।

বিকাশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনলাইন জুয়া, হুন্ডি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে তারা নিজেরাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালাচ্ছেন। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে তারা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) প্রতিবেদন পাঠান। পুলিশ ও সাইবার ইউনিট বলছে, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছ।| বিভিন্ন জেলায় একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা বা ভয় থেকে অভিযোগ করতে চান না| ফলে মূল চক্র অনেক ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অপরাধ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝