জাপার দুর্গ চুরমার: এবার 'অস্তিত্ব রক্ষার' স্থানীয় নির্বাচন
নিজস্ব প্রতিবেদক :

রংপুরসহ দেশজুড়ে নজিরবিহীন নির্বাচনী বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই এবার তৃণমূলের ভোটে নজর দিচ্ছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। আগামী ডিসেম্বরের সম্ভাব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে সাংগঠনিক ভিত গোছানোর তাগিদ দিচ্ছেন দলটির মাঠপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা।
নির্বাচন কমিশনও এরই মধ্যে এই স্তরের ভোটের মাঠের প্রাথমিক প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছে বলে জানা গেছে। তবে সদ্যসমাপ্ত সাধারণ নির্বাচনে লাঙ্গলের যে নজিরবিহীন পতন ঘটেছে, তার রেশ ধরে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন নিয়েও তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মনে দেখা দিয়েছে গভীর সংশয় ও উদ্বেগ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যদি জাপা ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে দলটির রাজনৈতিক অস্তিত্ব চরম সংকটের মুখে পড়বে।
চার দশকের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এবারই প্রথম সম্পূর্ণ 'শূন্য' হাতে ফিরতে হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত এই দলটিকে। সারা দেশে ১৯৬টি আসনে প্রার্থী দিয়েও একটি জয়ের মুখও দেখতে পারেনি লাঙ্গল প্রতীক।
এরশাদের আদি নিবাস হওয়ায় উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলটিকে বরাবরই জাতীয় পার্টির অপরাজেয় দুর্গ ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোটব্যাংক ধরা হতো। কিন্তু এবারের ভোট বিপ্লবে সেই দুর্গের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হাতছাড়া হয়েছে দলটির। রংপুরের কোনো আসনেই খাতা খুলতে পারেনি জাপা; বরং উত্তরবঙ্গের এই শক্ত ঘাঁটিতে একক আধিপত্যের সঙ্গে বড় জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সবচেয়ে বড় চমক ছিল রংপুর-৩ আসনে, যেখানে বিগত দ্বাদশ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা তথা জাপার বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং গাইবান্ধা-১ আসনে দলের মহাসচিব মো. আশরাফুল আলম খান (হায়দার পাটোয়ারী) বিপুল ভোটের ব্যবধানে তৃতীয় স্থানে ছিটকে পড়েছেন।
রংপুর বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী আসনগুলোর ফলাফল ও ভোট প্রাপ্তির চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে জাতীয় পার্টির এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পতনের প্রকৃত রূপ পরিষ্কার হয়ে ওঠে:
নির্বাচনী আসন বিজয়ী প্রার্থী ও দল প্রাপ্ত ভোট প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দল প্রাপ্ত ভোট জাতীয় পার্টির নির্বাচনী দশা রংপুর-১রায়হান সিরাজী (জামায়াত)১,৭৪,২৪৫ মোকারম হোসেন সুজন (বিএনপি) ৬৯,১৩১ জামায়াত প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে জাপা প্রার্থীর পরাজয়।
রংপুর-২ এটিএম আজাহারুল ইসলাম (জামায়াত) ১,৩৫,৫৫৬ মোহাম্মদ আলী সরকার (বিএনপি) ৮০,৫৩৮ জামায়াতের কাছে লাঙ্গলের বড় পরাজয়।
রংপুর-৩ মাহবুবার রহমান বেলাল (জামায়াত) ১,৭৫,৮২৭ শামসুজ্জামান সামু (বিএনপি) ৮৪,৫৭৮ জিএম কাদের (জাপা): ৪৩,৩৮৫ ভোট পেয়ে ৩য় স্থান।
রংপুর-৪ আকতার হোসেন (এনসিপি) ১,৪৯,৯৬৬ এমদাদুল হক ভরসা (বিএনপি) ১,৪০,৫৬৪ এনসিপি প্রার্থীর কাছে লাঙ্গলের আসন হাতছাড়া।
রংপুর-৫ গোলাম রব্বানী (জামায়াত) ১,৭৬,৪১১ গোলাম রব্বানী (বিএনপি) ১,১৫,১১৬ জামায়াত প্রার্থীর বড় জয়, জাপা ভোটের দৌড়ে ছিটকে গেছে।
রংপুর-৬ নুরুল আমীন (জামায়াত) ১,২০,১২৮ সাইফুল ইসলাম (বিএনপি) ১,১৭,৭০৩ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর জামায়াতের জয়, লাঙ্গলের বিপর্যয়।
গাইবান্ধা-১ মাজেদুর রহমান (জামায়াত) ১,৪০,৭২৬ খন্দকার জিয়াউল ইসলাম (বিএনপি) ৩৭,৯৯৭ হায়দার পাটোয়ারী (জাপা): ৩৩,০০০ ভোট পেয়ে ৩য় স্থান।
জাতীয় নির্বাচনের এই গভীর ক্ষত ও রাজনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতেই মূলত এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর ছক কষছে দলটি। মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা কর্মীদের হতাশা দূর করে আবারও তৃণমূলকে চাঙ্গা করার প্রাথমিক চেষ্টা শুরু করেছেন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ ভোটারদের মনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে যে ব্যাপক অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি কাটিয়ে উঠে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের টিকিয়ে রাখা জাতীয় পার্টির জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।
এসব বিষয় নিয়ে দলের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম গোপন রাখার শতে জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গড়া দলটি আগে ছিল ৫ ভাগ। এখন হয়েছে ৬ ভাগ। ৫ ভাগ যখন ছিল তখনও দলের মধ্যে বেশ কয়েকজন রাগব ভোয়ল নেতা ছিল। এখন মুল দলে বড় কোন নেতা বা পারলামেন্টরী নেই। ফলে এই দলের রাজনৈতিক বভিষ্যত জিরো। তার মতে স্থানীয় নির্বাচনেও জাপার ভড়াডুবি হবে।
আ. দৈ./কাশেম/ হেলাল




















