বিষাক্ত বাতাসে দমবন্ধ রাজধানী
বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় বারবার ঢাকা, বাড়ছে মৃত্যু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
শাহীন রহমান॥

গত কয়েদিন ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে অঝোরে ঝড়ছে বৃষ্টির ধারা। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় রাজধানীতে ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে বায়ুর মান ভালো হবে, এমনটাই আশা করা যায়। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানী ঢাকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী। বায়ুর মান ১৭৭। এই মানকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। টানা বৃষ্টিতেও কেন বায়ু দুষণ বাড়ছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে বিশেষজ্ঞদের।
বায়ুমান বিশেষজ্ঞ ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, রাজধানী জুড়ে উন্মুক্ত অবস্থায় নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে, খোলা অবস্থায় সবকিছু ফেলে রাখা হয়েছে। এ পথ দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর চাকায় এসব ধুলাবালু জমবে আর সেগুলো পড়বে বড় সড়কে। রাজধানীতে অন্তত ৩০০ জায়গা পাবেন এমন। এগুলোর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ নেই। বৃষ্টি হলে তাই সাময়িকভাবে হয়তো দূষণ কমছে, কিন্তু এসব স্থান থেকে দ্রুত আবার ধুলাবালু ছড়িয়ে পড়ছে। আর এর সঙ্গে ত্রুটিযুক্ত যানবাহন তো আছে। সেগুলোর একটিও তো হাঁকডাক দিয়ে বন্ধ করা যায়নি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন রাজধানী ঢাকার বাতাস দিন দিন আরও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় নিয়মিতভাবে উঠে আসছে এই শহরের নাম। শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে অনেক সময় বাতাসের মান “অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর” বা “বিপজ্জনক” পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বায়ুদূষণের কারণে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুস ও হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে রাজধানী বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা (সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ ও এয়ার পিউরিফিকেশন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান)’র তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিভিন্ন সময় ঢাকার বায়ুমান সূচক ২০০ থেকে ৩৫০-এর মধ্যে ওঠানামা করেছে। কোনো কোনো দিনে তা ৪০০ এর কাছাকাছিও পৌঁছেছে। সূচকে ৫০ পর্যন্ত ভালো, ১০০ পর্যন্ত সহনীয়, ১৫০-এর ওপরে অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০০-এর ওপরে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাতাসে পিএম ২.৫ নামের সূক্ষ্ম বস্তুকণার নিরাপদ মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রামের নিচে থাকা উচিত। কিন্তু ঢাকায় শুষ্ক মৌসুমে এই মাত্রা প্রায়ই ১৫০ থেকে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি দূষণ নিয়ে বসবাস করছেন রাজধানীবাসী। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস নির্মাণকাজের ধুলা, পুরোনো যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, শিল্পকারখানা এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো। বিশেষ করে মেট্রোরেল, সড়ক উন্নয়ন, বহুতল ভবন নির্মাণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের কারণে রাজধানীতে ধুলাদূষণ ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরিবেশবিষয়ক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের জন্য দায়ী রাস্তার ধুলা ও নির্মাণকাজ। অন্যদিকে যানবাহনের ধোঁয়া থেকে আসে প্রায় ২৫ শতাংশ দূষণ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্মাণসামগ্রী খোলা ট্রাকে বহন করা হচ্ছে, রাস্তার পাশে পড়ে আছে বালু ও মাটি। অনেক এলাকায় নিয়মিত পানি ছিটানো বা ধুলা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সামান্য বাতাসেই ধুলা ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশে। ঢাকার বায়ুদূষণের আরেক বড় কারণ পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলচালিত বাস ও ট্রাক থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় রয়েছে বিষাক্ত কার্বন, সালফার ও ভারী ধাতু। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকায় এসব দূষণ একই এলাকায় জমে থাকে এবং মানুষ বাধ্য হয়ে তা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় এখনও অনেক অবৈধ ইটভাটা চালু রয়েছে। এসব ইটভাটায় নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর ধোঁয়া ও বস্তুকণা। শুষ্ক মৌসুমে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে এসব দূষণ ঢাকায় প্রবেশ করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। চিকিৎসকেরা বলছেন, বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় শিকার শিশু ও বয়স্করা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট এবং শিশু হাসপাতালগুলোতে শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের একজন চিকিৎসক বলেন, “আগে শীতকালে শ্বাসকষ্টের রোগী বাড়ত। এখন প্রায় সারা বছরই রোগীর চাপ থাকে। দূষিত বাতাসের কারণে শিশুদের ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর বায়ুদূষণজনিত কারণে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ রাজধানী ও আশপাশের এলাকার। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যয় ও কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কারণে অর্থনীতিতেও বড় ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে সরকার বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান, ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মাণকাজে ধুলা প্রতিরোধে নির্দেশনা দিয়েছে। রাজধানীর কিছু এলাকায় নিয়মিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, এসব উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। তাঁদের মতে, আইন থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল হওয়ায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে অবিলম্বে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, গণপরিবহন উন্নয়ন, পুরোনো যানবাহন অপসারণ, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক করা এবং শহরে সবুজ এলাকা বৃদ্ধি। এ ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং শিল্পকারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিচ্ছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণ এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কোটি মানুষ বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, রাজধানীর বায়ুদূষণের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে ঢাকায় চলমান অসংখ্য নির্মাণ প্রকল্প, খোঁড়াখুঁড়ি ও অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণসামগ্রী বহনের কারণে বাতাসে বিপুল পরিমাণ ধুলিকণা ছড়াচ্ছে। রাস্তা নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় এসব ধুলা যানবাহনের চাপে আবার বাতাসে মিশছে। পুরোনো বাস, ট্রাক ও ডিজেলচালিত যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া রাজধানীর দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। ট্রাফিক জ্যাম দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় একই এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ধোঁয়া জমে থাকে। ঢাকার আশপাশে থাকা ইটভাটা ও ছোট শিল্পকারখানাগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই অনেক ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোলা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা পোড়ানোর প্রবণতাও বায়ুদূষণের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে বিষাক্ত গ্যাস ও ক্ষতিকর কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসকরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের সংক্রমণ, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর বায়ুদূষণজনিত কারণে হাজারো মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। এর ফলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি কর্মক্ষমতাও কমছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বেশি হওয়ায় তারা তুলনামূলক বেশি দূষিত বায়ু গ্রহণ করে। এতে নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতা বাড়ছে। রাজধানীর স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের প্রবণতাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার বিভিন্ন সময়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, পুরোনো যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মাণকাজে ধুলা কমানোর নির্দেশনা দিয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন সড়কে পানি ছিটানো, ময়লা অপসারণ এবং সবুজায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ এখনও পর্যাপ্ত নয়।
বায়ুদূষণের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ছে। অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, নাগরিক সচেতনতা ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া রাজধানীর বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব নয়। পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা ছাড়া পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আসবে না। সব মিলিয়ে, রাজধানীর বায়ুদূষণ এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
আ. দৈ./কাশেম/ এস রহমান




















