কে ঠেকাবে লামার কাঠ পাচার
রাসেল দাশ, লামা (বান্দরবান)

বান্দরবানের লামায় বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকতা কেএম কবির উদ্দীনের বিরুদ্ধে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অবৈধ কাঠ পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ যেনো স্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। কাঠ পাচারকারী সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠেছে লামায়।
কবির হোসেনদের মতো বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকতাদের ম্যানেজ করে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সেগুন, গামারী ও গর্জন কাঠ পাচারে সড়ক পথে চলছে মহোৎসব। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে লামা সদর ও রুপসী পাড়া ইউনিয়ন থেকে সড়ক পথে লামা বাজার ও বমু রিজার্ভ এলাকা থেকে প্রকাশ্যে শত শত গাড়ী ভর্তি গাছ পাচার হওয়ায় বন বিভাগের নীরব ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে তারা কি বনভূমি রক্ষক নাকি ভক্ষক।
জানা গেছে, ইতিপূর্বে কক্সবাজারের রামু জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকাকালীন বনবিটে সুফল প্রকল্পের অধীনে ২০২২-২০২৩ এবং ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে ৮৭২ হেক্টর বনায়ন প্রকল্পের কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগও উঠে কেএম কবির উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
সরেজমিন জানা গেছে, লামা সদর ইউনিয়নের পোঁপা মৌজা এবং রুপসী পাড়া ইউনিয়নের নাইক্ষ্যংমুখ এলাকা ও লামা খাল, পোপা খালের উজান, কোহ্লাখ্যা পাড়া, ইয়াংছা কাঠাল ছড়া, বনফুর পাড়া, বমু রিজার্ভ সহ বিভিন্ন দুর্গম ঝিরি পথে গাড়ি দিয়ে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই সড়ক দিয়ে শতাধিক কাঠ বোঝাই ছোট-বড় ট্রাক, জিপগাড়ি ও ভ্যানের মাধ্যমে কাঠ পাচার করে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট অংকের টাকার বিনিময়ে এসব যানবাহন থেকে কাঠ পাচার করা হয়। বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান কাঠ বোঝাই প্রতি ট্রাক থেকে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা, প্রতি জিপগাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ টাকা, বাঁশ বোঝাই ট্রাক থেকে ২ থেকে আড়াই হাজার এবং জ্বালানি কাঠ বোঝাই ট্রলি থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ বাদীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন বিকেল ৫টার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই কাঠ পাচারের কর্মকাণ্ড। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি গাড়িতে করে অবৈধ কাঠ ও জ্বালানি লাকড়ি বিভিন্ন ইটভাটা ও স্থানীয় বাজার, পাশ্ববর্তী উপজেলা চকরিয়া ও লোহাগাড়া পাচার করা হয়।
বন খেকোদের এমন তাণ্ডবে লামার পোপা হেডম্যান পাড়া, গিলা পাড়া, খ্রিস্টান পাড়া এবং কাইরম পাড়াসহ রুপসীপাড়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বনজ সম্পদ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। গত কয়েক বছরে এই সিন্ডিকেট অন্তত হাজারো শতবর্ষী বাগানের মূল্যবান গাছ কেটে সাভার করেছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। ফলে একদিকে পাহাড় ন্যাড়া হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে পাহাড়ে বসবাসকারী বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানায়, বাগান থেকে কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করে কাঠ পাচারের লাইন নিতে হয়। মূলত এই ‘ম্যানেজ প্রথা’র কারণেই কাঠ পাচারের ট্রাকগুলো খুব সহজেই সব বন চেকপোস্ট পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। রাষ্ট্রের বনসম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যাস্ত, তাদের এমন পরোক্ষ সহযোগিতা অবাধে কাঠ পাচার করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
রুহুল আমিন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, জোত পারমিট বিহীন বাগান কাটতে হলে বন বিভাগের কর্মচারীর মাধ্যমে লামা সদর রেঞ্জ কর্মকতাকে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। এছাড়াও কাঠ, লাকরির প্রতি গাড়ি ছোট হলে ৩শত টাকা থেকে ৭শত ও এক হাজার পর্যন্ত দিয়ে লাইন নিতে হয় বন বিভাগের। লাইন না নিয়ে কোনভাবে প্রকাশ্যে অবৈধ কাঠ পাচার করার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে নির্বিচারে বন উজাড় চলতে থাকলে পাহাড়ি এলাকায় মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পাবে এবং অচিরেই পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জানা যায়, ১৯২৭ সালের বন আইন (বাংলাদেশ সংশোধিত) অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা, অপসারণ বা পরিবহন করা গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের আওতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা, বড় অংকের অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও লামার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য।
এ বিষয়ে লামা সদর রেঞ্জ কর্মকতা কবির হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে আজকের দৈনিককে বলেন, আমি লাইন দিচ্ছি না। আমার নাম ব্যবহার করে কারা এই কাজ করে খুঁজে বের করুন। জনবল কম থাকলেও থাকলেও আমরা পাচার রোধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে লামা বিভাগীয় বন কর্মকতা মোস্তাফিজুর রহমানের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার নক দিয়েও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে সিএফ ও মোল্লা রেজাউল করিম বলেন, তথ্য প্রমান সহ অফিসে আসেন, দেখে মন্তব্য করতে পারবো।
আ. দৈ./কাশেম/ জাকির




















