রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভয়ংকর প্রতারক সোনারগাঁওয়ের রতন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ৭:১৪ পিএম  আপডেট: ০৪.০৫.২০২৬ ৮:২৯ পিএম  (ভিজিট : ৯৭)
X

ভয়ংকর এক প্রতারকের নাম নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার লেদামোদি গ্রামের আবুল হাসেম  রতন। ব্যবসার টাকা আত্মসাৎ, জমি বেচা-বিক্রি, মিথ্যা প্রলোভনে এবং অবৈধভাবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তার কাজ। তবে তার বেশভূষা দেখে চেনার উপায় থাকে না। 

এ কারণে তার প্রতারণায় সর্বস্বান্ত হয়ে অনেক ভুক্তভোগি থানা, আদালতে মামলাও করেছেন।  পতিত সরকারের এই দোসর বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে এখন বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন।পুলিশের অপরাধ ডাটাবেজ ঘেঁটে পাওয়া গেছে, ভয়ংকর প্রতারক রতনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর একটি মামলা দায়ের করা হয়। 

সিআর মামলা নম্বর ১২২/২৪। এই মামলায় প্রাথমিক তদন্তে রতনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতে ইতোমধ্যেই  চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ । আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেন আদালত। ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানায় রতনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অপর একটি মামলা হয়। 

মামলা নম্বর-৭। মামলায় তার বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩২৩, ৩৩৩, ৩৫৩ এবং ৩০৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায়ও রতনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।  এছাড়া ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর রাজধানীর কামরাঙিরচর থানার মামলায় পেনাল কোডের ৪০৬/৪২০/৫০৬ ধারায় আসামি আবুল হাসেম রতন ও মো.,আবুল কাসেম খোকন উভয় পিতা- মো. আব্দুল কাদের। স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম-লেদামদি, থানা-সোনারগাঁ, জেলা নারায়নগঞ্জকে আসামি করা হয়।  মামলা নম্বর-০৬।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওয়ালটন গ্রুপের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য এক্সক্লুসিভ ডিলার হিসেবে মনোনীত হন প্রতারক রতন। লোক দেখানো স্বর্ণা ইলেকট্রনিক্স এর নামে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে তার আপন বড় ভাই খোকনকে ব্যবসা পরিচালনা এবং জামিনদার হিসেবে মনোনীত করেন প্রতারণার অংশ হিসেবে । ব্যবসা শুরুর প্রথম দিকে নগদে ও বাকিতে লেনদেন করে বিশ্বস্ততা অর্জন করেন। যা ছিল তার প্রতারণার কৌশল। 

আরও বাকিতে পণ্য চাইতে থাকে এবং আশ্বাস দেয় যে, শিগগিরই  বাকি থাকা  পণ্যের অর্থ পরিশোধ করা হবে। পরবর্তীতে, প্রতারণামূলক এবং কোম্পানির অর্থ ও পণ্য আত্মসাৎ এর উদ্দেশ্যে অধিক পরিমানে ওয়ালটন পণ্য বাকিতে ক্রয় করে কম পরিমানে টাকা পরিশোধ করতে থাকেন। 

এক পর্যায়ে আসামিদের কাছে পাওনা টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় উল্লেখিত টাকা। পরে ওয়ালটনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আসামিদের লালবাগ এলাকার বর্তমান ঠিকানায় গিয়ে পাওনা টাকা পরিশোধ করার কথা বললে খোকন টাকা পরিশোধে অস্বীকার করে এবং হমকি দেন।  আবার টাকা চাইতে গেলে শারীরিক নির্যাতন,  এমনকি  হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় ।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, কামরাঙ্গীরচর চৌরাস্তা রনি মার্কেটে 'স্বর্ণা' ইলেকট্রনিক্সের স্বতাধিকারী ও প্রতারক  মো. রতন মিয়ার আবেদনে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি এক্সক্লুসিভডিলার হিসেবে কামরাঙ্গীরচরে  মনোনীত করে দেশের  ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানি ওয়ালটন। এরপর থেকে ব্যবসার নামে নানা টালবাহান ও ছলচাতুরি করে  ওয়ালটন ও এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের  মোট পাওনা ১৯ কোটি ২৬ লাখ ৪৩ হাজার ৮১৩.০৭ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। 

এখন ব্যবসাতো করেনই না, কোম্পানি যোগাযোগ করেও তার হদিস পাচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ আত্মসাৎ করা টাকা দিয়ে তার  আপন ভাই ব্যবসা করছেন বলে সন্দেহ  করা হচ্ছে।  প্রতারণার বীজ ওয়ালটনের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নেওয়ার শুরু থেকে বপণ করেন রতন। এ কারণে জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম 'আবুল হাসেম রতন থাকলেও  স্বর্ণা ইলেকট্রনিক্সের শো-রুম নেওয়ার সময় দেওয়া নাম দেন মো. রতন মিয়া। ৩ বছর ধরে এখানে শোরুমটিও নেই।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতারক রতনের বড় ভাই আবুল হাসেম সোনারগাঁও এ স্থানীয় জাতীয় পার্টির ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এই সুবাদে  প্রতারক ও চতুর রতন কোন পদ-পদবীতে না থাকলেও  জাতীয় পাটির রাজনীতির পাশাপাশি ওই সময় সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের  রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্তানীয় রাজনীতির নানা কর্মসূচিতে অর্থের যোগানও দিতেন গোপনে। 

যে পরিচয় সেই সময়ের কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গেও তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। অন্যায় প্রভাবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানা এলাকায় অনেক মানুষের কাছ থেকে জমি বেচা-বিক্রি বা নানা তদবিরের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এ নিয়ে ভুক্তভোগিরা থানায় অভিযোগ করলে প্রতারক রতন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে   প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফেলতেন। কামরাঙ্গীরচরে বিভিন্ন ইলেকট্রিক কোম্পানির শোরুমের মালিকদের  কাছ থেকেও এই প্রভাবে  অন্যায়ভাবে জোরপূর্বক  বিপুল পরিমাণ টাকা চাঁদা আদায় করতেন। 

এ অন্যায় কাজ জায়েজ করতে রতন স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর ও বহুল আলোচিত মো. হোসেনের সঙ্গে সখ্যতা গড়েতোলেন। এ জন্য কাউন্সিলরকে দামি একটি নোহা গাড়িও উপহার দেন। এলাকায় খোঁজ নিলে যার সত্যতা পাওয়া যাবে।  আত্মসাৎ বা বিপুল পরিমাণ অবৈধ এই টাকা দিয়ে রতন মিয়া এখন আমেরিকা কিংবা লন্ডনে বিলাসী জীবনযাপন করছেন।  বিদেশে রতন টাকা পাচার করতে পারেন, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত করা উচিত।

তদন্তে আরও জানা গেছে, কোম্পানি ব ব্যক্তির টাকা আত্মসাৎ করে খ্যান্ত থাকে না প্রতারক রতন। একটি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে।  মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে প্রোপাগান্ডা চালায়। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ভাড়াটে লোক এনে মানববন্ধন সহ-সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানোসহ  প্রতিষ্ঠানের  সুনাম নষ্টের হীন ষড়যন্ত্র করে । 

সিআইডি সদর দপ্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান  বলেন, 'এ ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য আমরা কাজ করছি।' ঢাকা ও এর আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে ওয়ালটনসহ বিভিন্ন কোম্পানির ইলেকট্রনিক্স  পণ্য বিক্রি করে আসছেন এমন কয়েকজন   ডিস্ট্রিবিউট বা মালিক এ প্রতিবেদককে জানান,  আমরা সততা,  মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ব্যবসার মাধ্যমে বৈধভাবে  অর্থ উপার্জনের জন্য এসেছি।

 এ কারণে বিশ্বাস করে কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকার পণ্য দেয় নগদ টাকা ছাড়াই। পণ্য বিক্রি করে নিয়মিত কোম্পানিকে টাকাও পরিশোধ করছি। কোন প্রতারণা করতে আসেনি। তবে যারা এ কাজ করছে তারা প্রকৃত অর্থেই ব্যবসায়ী না তারা প্রতারক। 

একাধিক প্রতিষ্ঠিত  ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তা এ প্রতিবেদককে বলেন,  দেশের প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য অনেক কোম্পানির মালিক এই জাতীয় প্রতারকদের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে আছেন। বছরের পর বছর তারা কোম্পানির কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার পণ্য নিয়ে  বিক্রি করলেও বিক্রিত টাকা না দিয়ে টালবাহান করছেন।

 এমন প্রতারকদের বিরুদ্ধে কার্যকর  কোন ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না। তাহলে কি পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প উদ্যোক্তারা এসব প্রতারক চক্রের কাছ থেকে তাদের পাওনা টাকা উদ্ধার করতে পারবে না এমন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ  মোঃ শামসুল হক  বলেন, শুধু মামলা করলেই হবে না, যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণাদি নিয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতারি পরোয়ানা বের করতে হবে।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অপরাধ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝