রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হামের প্রাদুর্ভাব , আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুর সংক্রমণ ও মৃত্যু
শাহীন রহমান
প্রকাশ: রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ৭:১১ পিএম  আপডেট: ০৪.০৫.২০২৬ ৫:০৮ পিএম  (ভিজিট : ১৩৬)
X

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামে ও হামের উপসর্গে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে করে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৪ জনে। এদিকে দেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে ইউনিসেফের সম্প্রতি রিপোর্টেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বড় ধরনের হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে, যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউনিসেফ ও সরকার যৌথভাবে জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাশপাশি এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। শিশুদের বাঁচাতে দ্রুত ও ব্যাপক টিকাদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে জরুরি।

এদিকে সরকার হামের প্রাদুর্ভাব রোধে নতুন করে টিকাদান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। গত ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশেই টিকা প্রদান শুরু হয়েছে। এর আগের বিভাগীয় শহর এবং যেসব এলাকায় বেশি সংক্রমন দেখা দিয়েছে সেসব এলাকা টিকার কর্মসুচি শুরু করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন আগের সরকারগুলোর অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সরকার চেষ্টা করছে দ্রুত উন্নতি করতে। জরুরি ভিত্তিতে টিকা দান কর্মসূচী চলছে। টিকাদানের হার ৮১ শতাংশে উন্নিত হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। 

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে একজনের শরীরে হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে এবং বাকি নয়জনের মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল। অঞ্চলভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, মৃতদের মধ্যে ঢাকায় ৪ জন, বরিশালে ২ জন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটে একজন করে রয়েছে। এতে স্পষ্ট যে রোগটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১,১৬৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৪৯১ জনে। এদের মধ্যে ৫ হাজার ৩১৩ জনের শরীরে হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৮১৬ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং চিকিৎসা শেষে ২৪ হাজার ৯০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুদের সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই প্রাদুর্ভাব বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও বলছেন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আবারও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিদিন যে হিমাব দেয়া হচ্ছে হামে আক্রান্ত ও মৃতের হার তার চেয়েও বেশি। তারা বলছেন সরকার শুরু সরকারি হাসপাতালে হিসাব দিচ্ছে। প্রতিদিন বেসরকারি হাসপাতালে হাম নিয়ে ভর্তি রোগি এবং মৃতের তথ্য সরকারের কাছে নেই। ফলে দেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে সঠিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা বলছেন হামের যে প্রাতদুর্ভাব শুরু হয়েছে তার দায় অন্তর্বর্তী সরকার ও অতীতের আওয়ামী লীগ সরকার এড়াতে পারে না।  অন্তবর্তী সরকার স্বাস্থ্যের সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করায় এমএনসিএইচ ওপির আওতায় টিকা সংগ্রহ করেনি। স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. আমিরুল মোর্শেদ বলেন হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃতের যে হিসাব প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে বেশি।  বেসরকারি হাসপাতালে খোজ নিয়ে দেখা গেছে হামের রোগী খারাপ অবস্থা নিয়ে ভর্তি হয়েছে। কেউ কেউ অনেক দিন পর্যন্ত ভর্তি রয়েছে। এদের সংখ্যা জাতীয় হিসেবে আসছে না। সরকার শুধুমাত্র সরকারি হাসপাতালের পরিসংখ্যান রাখছে বা গণমাধ্যমে জানাচ্ছে তার বাইরে হাজার বেসরকারি হাসপাতালের পরিসংখ্যান আমরা জানতে পারছি না। 

এদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও জটিলতার হার বেশি হওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে গুরুতর সংকট হিসেবে দেখছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় দেশে একটি বড় “ইমিউনিটি গ্যাপ” তৈরি হয়েছে। অনেক শিশু এখনো প্রয়োজনীয় টিকা পায়নি, যাদের “জিরো-ডোজ” শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর ফলে হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে হাম শুধু একটি সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ির রোগ নয়, এটি মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বেড়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত শয্যা, ওষুধ ও চিকিৎসাকর্মীর সংকটও দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকাদান। তাই অভিভাবকদের সচেতন হয়ে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দ্রুত নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে হামের মতো সংক্রামক রোগ সহজেই বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই প্রাদুর্ভাব আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


আ. দৈ./কাশেম/ এস রহমান


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
স্বাস্থ্য- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝