রাজবাড়ীতে ২০৪ জাতের আঙুর বাগান
শখের আঙুর বাগানই ভাগ্যের চাকা ঘুরছে ফারদিনের
মীর সামসুজ্জামান সৌরভ,রাজবাড়ী

শখের বসে আঙুর বাগানই আজ ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাচ্ছে ফারদিন আহমেদের। দেড় বিঘা জমিতে ২০৪ টি ভিন্ন ভিন্ন জাতের আঙুর চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন রাজবাড়ীর অজপাড়াগাঁয়ের এক তরুণ উদ্যোক্তা ফারদিন আহমেদ। তিনি মূলত শখের বসে আঙুর বাগান শুরু করলেও বর্তমানে এটি একটি সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
আধুনিক পদ্ধতিতে মাচা তৈরি করে তিনি এই আঙুর চাষ করছেন। বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ায় আঙুর চাষ যে সম্ভব এবং লাভজনক, ফারদিন তা প্রমাণ করেছেন।
তার এই অভাবনীয় সাফল্য দেখতে এবং আঙুর চাষে উদ্বুদ্ধ হতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার বাগানে ভিড় করছেন।ফারদিন আঙুর উৎপাদনের পাশাপাশি আগ্রহী কৃষকদের জন্য চারা উৎপাদন ও বিপণন করছেন।
তরুণ উদ্যোক্তা ফারদিনের বাড়ি জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের কুঠি পাঁচুরিয়ার মোল্লাপাড়া গ্রামে। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন।তিনি বাড়ির পাশেই গড়ে তুলেছেন "গ্রেপ ইঞ্জিনিয়ারিং এগ্রো এন্ড রিচার্জ" নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
জানা গেছে, ২০২০ সালে করোনার সময় নিজের কোচিং সেন্টার বন্ধ হয়ে গেলে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ার এ.এস.ফারদিন আহমেদ। শখ করে বাড়ির উঠানে লাগান একটি আঙুর গাছ।গাছটিতে ফলন এলেও ছিল না খাওয়ার উপযোগী।তবে হাল ছাড়েননি ফারদিন।
২০২৫ সালের মে মাসে বাড়ির পাশের দেড় বিঘা জমিতে শুরু করেন বাণিজ্যিক আঙুর চাষ। দেশ বিদেশ থেকে বিভিন্ন জাতের চারা সংগ্রহ করে এক এক করে রোপণ করেন ২০৪ জাতের প্রায় ৫০০টি গাছ।

এর মধ্যে অন্যতম রাশিয়ান বাইকোনুর, ইউক্রেনের ভ্যালেজ, জাপানি রুবিরোমান, ল্যাম্বরগিনি, ফ্যান্টাসি সিডলেস, ব্লাক ম্যাজিক, ফুজিগ্লো, লোরাস, ন্যারো সিডলেস, গ্রিন লং, অটুমান রয়েল, অস্ট্রেলিয়ান কিং সহ ইতালি, চায়না, ভারত, থাইল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশের ২০৪ জাতের চারা তার সংগ্রহে রয়েছে তার। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আঙুরের চারা বিক্রি করছেন ফারদিন।এটিকে লাভজনক ব্যবসা বলেই মনে করেন তিনি।ভবিষ্যতে এই বাগানকে ঘিরে রিসোর্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর চাষ হয় না; এমন ধারণা থেকে ফারদিনের আঙুর বাগান করতে দেখে একসময় হাসাহাসি করতেন অনেকেই। তারাই এখন গর্ববোধ করেন ফারদিনকে নিয়ে।বর্তমানে আরও সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে বাইকোনুর জাতের আঙুর চাষ করছেন ফারদিন। আঙুর ও চারা বিক্রি করে প্রতিবিঘায় বছরে ১০ লাখ টাকা লাভের আশা তার।
উদ্যোক্তা ফারদিন আহমেদ বলেন, আমি পড়ালেখা করেছি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। কৃষি বিষয়ে আমার ধারণা খুবই কম ছিলো।২০২০ সালে শখ থেকেই বাড়ির উঠানে একটি আঙুর গাছ লাগিয়েছিলাম। তখন ইউটিউব দেখে আঙুর গাছের পরিচর্যা সম্পর্কে ধারণা নেই, কিভাবে ঔষুধ ও সার দিতে হবে সে বিষয়ে ধারনা পাই।পরে ২০২৫ সালে দেড় বিঘা জমির ওপর আঙুর বাগান করি। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ২০৪ জাতের মোট ৫০০ টি আঙুরের চারা সংগ্রহ করে বাগান করি।এখন পর্যন্ত আমার সাড়ে ১৩ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে।আমি আরও সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিক ভাবে আঙুর চাষ শুরু করেছি।

তরুণ এই উদ্যোক্তা আরও বলেন, আমি এই পর্যন্ত কৃষি বিভাগের কোন হেল্প বা পরামর্শ পাইনি।আমি ইউটিউবে আঙুর চাষ নিয়ে বিভিন্ন ব্লগ ও কনটেন্ট দেখে ধারণা নিয়েই বাগানটা করেছি।বাগান করে প্রথম বছরই ভালো ফলন হয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ চারা কিনতে আসছে। চারা বিক্রি করেও লাভবান হচ্ছি।শুরুর দিকে বাণিজ্যিক ভাবে না নিলেও আমি এখন বাণিজ্যিক ভাবে বৃহৎ পরিসরে আঙুর বাগান করবো।
উদ্যোক্তা ফারদিনের স্বজন সুফিয়া খাতুন বলেন, এই আঙুর বাগানে অনেক ফল ধরেছে।কখনো ভাবিনি এত আঙুর ধরবে এখানে।এই প্রথম আমি কোন আঙুর বাগান দেখছি, যেখানে থোকায় থোকায় আঙুর ঝুলছে।।দেখেই মন ভরে যাচ্ছে আমাদের। দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই এ বাগান দেখতে আসছে, তারা আঙুর ফলের চারা সংগ্রহ করছে।
বাগানের কর্মচারী মো. জুয়েল মোল্লা বলেন, আমি এই বাগান দেখাশোনার কাজ করি। প্রায় ১০ মাস আগে এই গাছ গুলো লাগানো হয়েছে।এই বছরই প্রথম ফলন হয়েছে। আমরা অনেক খুশি যে ফারদিন ভাই নতুন যে উদ্যোগটা নিয়েছে আমার সবাই যদি আমরা ঘরে ঘরে এই উদ্যোগটা নেই তাহলে বাইরে থেকে এই আঙুর আনার প্রয়োজন নেই।আমরা আশা করছি আমাদের আঙুর টা ভালো মানের হবে।
বাগানের আরেক পরিচর্যা কর্মী শহীদ মিয়া বলেন, উদ্যোক্তা ফারদিনের এই আঙুর বাগানের ফলে আমাদের ১০/১২ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। আমরা এই বাগানে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। বাগানের ম্যানেজার শরিফ ইসলাম বলেন, দেড় বিঘা জমির ওপর প্রায় ১০/১১ মাস ধরে এই আঙুর বাগান করা হয়েছে। আমি এর আগে কখনো আঙুর বাগান দেখিনি। এ বছর প্রথম এই বাগানে আঙুর ধরেছে।আমরা আশাবাদি যিনি এই বাগানটি করেছেন তিনি সফলতার দিকেই এগোচ্ছেন।
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম আজকের দৈনিককে বলেন, আমাদের দেশের মাটিতে বিদেশি জাতের আঙুর চাষ হচ্ছে এটা খুবই ভালো খবর আমাদের জন্য। আমাদের কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এই উদ্যোক্তাকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
আ. দৈ./কাশেম/ জাকির




















