ঝুঁকির মুখে ব্যাংকিং খাত
রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে অভিজ্ঞ ব্যাংকার নিয়োগ জরুরি
রমজান আলী

দেশেরব্যাংকিং খাত তীব্র আস্থার সংকট ও খেলাপি ঋণের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক লিমিটেড ও বিডিবিএল (বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি) ৬টি ব্যাংকের সুশাসন ফেরাতে এবং ধস ঠেকাতে অবিলম্বে অভিজ্ঞ, সৎ ও দক্ষ ব্যাংকারদের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মানুষ আশা করেছিল দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনেক উন্নতি হবে। আর্থিকখাতে বড় পরিবর্তনের আশা করছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই আশা মোটেও পূরণ করতে পারেনি অন্তর্বর্তীকালিন সরকার। বরং উল্টো আর্থিকখাতের অবস্থা আরো ভয়াবহ পরিনত হয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সর্বনিম্ন এসে পৌঁছিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো ও বিনিয়োগে আস্থা ফেরানোর মতো কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠন এখন বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শক্তিশালী আইনি কাঠামো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো ও সুশাসন নিশ্চিত করা- এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি ব্যাংকে এখন যারা আছেন, তারা সবাই অযোগ্য ব্যাংকার। এছাড়া এখন যারা আসতে চাচ্ছেন বা যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তারাও একই অবস্থা। তাই ব্যাংক খাত বাঁচানোর জন্য যোগ্য ব্যাংকারদের এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) পদে নিতে হবে। ব্যাংক বাঁচাতে এখন অবিলম্বে অভিজ্ঞ, সৎ ও দক্ষ ব্যাংকার নিয়োগ দিতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নজিরবিহীন ব্যাংক লুটপাটের ক্ষত ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। অনিয়ম ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রভাব ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠছে ব্যাংক খাতে। বেশির ভাগ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। এর ফলে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কমে যাচ্ছে আয়যোগ্য সম্পদের পরিমাণ। সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রবণতাও নিম্নমুখী। বিশেষত খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের সব সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে এ খাত।
বিএনপি সরকার গঠনের পর বিভিন্ন খাতে সংস্কারের কাজ শুরু করে দিয়েছে। তাই ঈদের পর থেকে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের আমূল পরিবর্তন আসছে বলে জানান বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্টরা। আগামী মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকেরর এমডিদের অপসারণ করে নতুন এমডি দেয়া হতে পারে। সেখানে সাবেক ও বর্তমান ডিএমডিদের মূল্যায়ন করা হতে পারে। এছাড়া নতুন করে সাজানো হবে সকল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, বর্তমানে ব্যাংকখাতে লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে সরকারকে কার্যকর ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এমন নীতি দরকার, যা অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করবে এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের পর অর্থনীতি সচল করতে সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়াই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য আর্থিকব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই কেবল বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ও দেশের অর্থনীতি টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে কিনা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে দেশের শিল্পখাতে বিনিয়োগ অনেকাংশে কমেছে। শুধু যে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে তা নয়, আস্থার সংকটে দেশীয় বিনিয়োগও নেমেছে প্রায় তলানিতে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চান শিল্পমালিকরা। ‘মন্দার’ অর্থনীতিতে ফেরাতে চান চাঙ্গা ভাব। এজন্য নতুন সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন তারা।
বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, ‘বর্তমানে পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তাই স্বল্পমেয়াদি হলেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর সমাধান দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শিল্পখাত আরও দ্রুত সম্প্রসারণ সম্ভব।’
ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারকেও বড় প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে ফয়সাল সামাদ বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা শিল্পের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদের হার কমানো গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন।’ একদিকে তহবিল তথা ফান্ড সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে, অন্যদিকে এলসি ওপেনিং নিয়ে জটিলতা। নানা অজুহাতে এলসি খুলতে বিলম্ব করা হচ্ছে। ফলে যথাসময়ে আমদানি করতে বিলম্ব হচ্ছে। আগের সরকারের সময় আমরা দেখেছি কীভাবে ব্যাংকগুলো লুটপাট হয়েছে এবং কীভাবে ব্যাংকের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে।
এখন দেখছি, ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের টাকাই আটকে রেখে বা নানা জটিলতার মাধ্যমে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা অসহায়ভাবে সবকিছু দেখছি, কিন্তু কার্যকরভাবে কিছু করতে পারছি না। সুতরাং, নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, ব্যবসায়ীদের এই সংকট থেকে উদ্ধার করা এবং ব্যাংকখাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা।
জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, কর্মসংস্থান বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে কর্মসংস্থান হবে না।
তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য বিপুল অঙ্কের টাকার দরকার। কিন্তু সেই টাকা তো বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশে পাচার করে নিয়ে গেছে। ফলে বেশির ভাগ ব্যাংকের অবস্থা এখন খুবই নাজুক। তাহলে বিনিয়োগের জন্য টাকা কোথা থেকে আসবে। মূলত এটিই হবে নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র জানায়, বর্তমানে মোট ব্যাংকের পঞ্চাশ ভাগ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। খেলাপি ঋণের ফাঁদে পড়ে এই ব্যাংকগুলো এক রকম পঙ্গু হয়ে গেছে। এখানে এখন সমস্যা দুটি। একটি হলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত কিভাবে দেওয়া হবে, দ্বিতীয়ত, আস্থাহীনতার কারণে নতুন আমানতকারীও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এ ব্যাংকগুলো দেশের বিনিয়োগ-অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখতে পারছে না।
অবশিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংক এখনো সবল থাকলেও বাকিগুলোর অবস্থা মধ্যম মানের। ফলে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে পরিমাণ বিনিয়োগ চাহিদা তৈরি হবে বলে ধারণা করা যায়, তার ধারে কাছেও ব্যাংকে পুঁজি নেই। এছাড়া বিনিয়োগের সামনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হলো উচ্চ সুদ। বর্তমানে ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তাহলে এই হারে সুদ দিয়ে কেউ ঋণ নিয়ে ব্যবসা করার সাহস দেখাবে না। বর্তমানে আমানত সংগ্রহের জন্য দুর্বল ব্যাংকগুলোর হাহাকার অবস্থা। এ কারণে সক্ষমতা না থাকলেও এসব ব্যাংক ১৩-১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত সংগ্রহ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে এটিও বড় দুর্যোগ তৈরি করবে। কারণ যারা এসব ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে ঋণে নিচ্ছে বা নেবে তারাও এক সময় খেলাপি হয়ে যাবে। ফলে ব্যাংক অর্থনীতির এ রকম নানামুখী ভুলের ঝুঁকি আগামী নির্বাচিত সরকারকে বেশ ভোগাবে।




















