রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডিসি অফিসের পিয়ন ফিরোজের অঢেল সম্পদ!
নিজেস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:২৯ পিএম   (ভিজিট : ১৩০)
X

মিথ্যা ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এমএলএসএস (পিয়ন) পদে চাকরি করছেন মো. ফিরোজ নামের এক কর্মচারি। ভোলা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও ভূয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা দেখিয়ে তিনি এ পদে চাকরি নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাছাড়া, ওই কর্মচারী ইতোমধ্যে নিজের এবং স্ত্রী লুবনার নামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। 

এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা, জনপ্রশাসন সচিব, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক আইনজীবী।  বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে আসলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে সাবেক জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশ দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল ওয়ারেছ আনসারীকে।

জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদ বদলি হলে তদন্ত নিয়ে শুরু হয় লুকোচুরি। অভিযুক্ত পিয়ন ফিরোজ অভিযোগকারীর আবেদন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে দীর্ঘদিন ধরে থেমে যায় তদন্ত কাজ। পরবর্তীতে বিগত ৩০ নভেম্বর তদন্ত শুরু হয়। এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাজিয়া সুলতানাকে তদন্তভার দেওয়া হয়। তিনি অভিযুক্ত ফিরোজকে নোটিস করেন এবং তদন্ত শুরু করেন। গত ১১ ডিসেম্বর তিনি অভিযোগকারীর বক্তব্য শোনেন এবং আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়।  

অ্যাড. নুরে আলম নোমান লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এমএলএসএস পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। শুধুমাত্র ঢাকা জেলার বাসিন্দাদের কাছ থেকে এ পদে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। অথচ মো. ফিরোজ ভিন্ন জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে অবৈধভাবে নিয়োগ নেন। সেই থেকে ফিরোজ অদ্যাবধি ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পিয়ন পদে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। 

মো. ফিরোজ মূলত ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। তার পিতার নাম মো. ইউছুপ, মায়ের নাম ময়ফুল। স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম আমিনাবাদ, ওয়ার্ড নং ৯, ডাকঘর আমিনাবাদ, উপজেলা চরফ্যাসন, জেলা ভোলা। শুধু তা-ই নয় তার বাপ-দাদার স্থায়ী ঠিকানাও ভোলার চরফ্যাসনে। কিন্তু তিনি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ঢাকা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা বলে চাকরিতে যোগদান করেন। 


ফিরোজের মা ময়ফুল মৃত্যুবরণ করেন ২০১০ সালে এবং বাবা মো. ইউছুপের মৃত্যু হয় ২০১১ সালে। ফিরোজের আপন ৩ ভাই ও ২ বোন। ফিরোজের মায়ের আগের স্বামীর ঘরের ১ ছেলে ও ১ মেয়ে সন্তান হিসেবে তার সৎ আরো ২ ভাই বোন রয়েছে। তারা সবাই ভোলার চরফ্যাসনের আমিনাবাদ ও তজুমদ্দিনের স্থায়ী বাসিন্দা। এমন কি তার বাপ-দাদাও ছিলেন চরফ্যাসনের স্থায়ী বাসিন্দা। মসজিদ কমিটির কাগজপত্রে দেখা যায়, ফিরোজ ২০২০ সাল থেকে তার গ্রামের কালিমুল্লা জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি দায়িত্বে রয়েছেন। 

গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফিরোজ ২০০৪ সালে চরফ্যাসনের আমিনাবাদ হাকিমিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, ২০০৬ সালে চরফ্যাসনের আমিনাবাদের কুইচ্চামারা ফাজিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন। এবং কুইচ্চামারা ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করেছেন। এই সময়গুলোতে তিনি গ্রামে অবস্থান করেই পড়াশোনা করেছেন। 

 ২০১১ সালে ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতে  ফিরোজ বাদী হয়ে চরফ্যাসনের জনৈক কবির হোসেনকে আসামি করে একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলার আরজিতে ফিরোজ তার স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করেছেন চরফ্যাসনের আমিনাবাদ গ্রামে। যার সিআর মামলা-১৯৮/১১। ফিরোজের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে ঢাকার ধানমন্ডি থানায় একটি চুরি মামলা হয়। ওই মামলায় জামিন নিতে গিয়ে ওকালতনামায় ফিরোজ তার স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করেন চরফ্যাসনের আমিনাবাদে। যার ধানমন্ডি থানার মামলা নং- ৮৩ (১)০৮, তারিখ: ৩১/০১/০৮।

সূত্র মতে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনে ফিরোজ ভোলা জেলার বাসিন্দা হওয়ার কারণে প্রথমে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেয়নি। পরে তিনি ঢাকার মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক অহিদ উল্লাহকে ভূয়া মামা পরিচয় দিয়ে ও তার পালক সন্তান দেখিয়ে মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে আবার কাগজপত্র জমা দেন। এ ক্ষেত্রে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রেও ঠিকানা জালিয়াতি করেন।

এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এমএলএসএস পদে চাকরিতে নিয়োগ লাভ করেন। এর আগে ২০১১ সালে ফিরোজের বাবা ইউসুফ মোল্লার মৃত্যুর পর ভোলা থেকে এসে ঢাকার কাওরান বাজারে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পিয়ন পদে চাকরি নেন। 


ডিসি অফিসে পদের চাকরিতে দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে বহাল তবিয়তে থাকাকালীন তার নানা পরিবর্তন লক্ষ্যনীয় হয়ে ওঠে। সামান্য এমএলএসএস পদে চাকরিতে তার বেতনের আয়ের সাথে ব্যয়ের কোন সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। কোটি টাকা ব্যয়ে জমি ক্রয় ও ইমারত নির্মাণ নিয়ে তাই নানা প্রশ্ন ওঠে।
ডিসি অফিসের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৩ বছরের বেশি এক স্থানে থাকলে বদলি হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু একই পিয়ন জেলা প্রশাসনের উর্ধতনদের ম্যানেজ করে দীর্ঘ ১১ বছর এখানেই চাকরি করছেন। 

ইতোমধ্যে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানার বাগনা মন্দির সংলগ্ন বাগনা এলাকায় ৩ তলা বাড়িসহ ৫ কাঠা জমি ক্রয় করেছেন। যার আনুমানিক মূল্য ২ কোটি টাকা। ভোলার চরফ্যাসন পৌর এলাকার ৬ নং ওয়ার্ডের জালাল মহাজনের চৌমুহনীর দক্ষিণ পাশে উচ্চমূল্যে ৬ কাঠা জমি কিনে ইমারত নির্মান করেছেন- যা সরজমিনে দেখা যায়। যার বর্তমান বাজারমূল্য ১ কোর্টি ৩০ লাখ টাকা। তাছাড়া সাভার এলাকায় রয়েছে তার ৬ কাঠার জায়গা। 

ফিরোজের নামে চরফ্যাসন উপজেলার ৫ নং আমিনাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নাগরিক সনদের কপিও রয়েছে। তাছাড়া, ফিরোজ ক্লার্ক সমিতির আবেদনপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্রে তার স্থায়ী ঠিকানা ভোলার চরফ্যাসনের আমিনাবাদ গ্রামে উল্লেখ করেছেন। যা ওই সমিতির রেজিস্ট্রার বইতে উল্লেখ রয়েছে। যা তিনি ঢাকা আইনজীবী সহকারি ক্লার্ক (মুহরি) সমিতির সদস্য হওয়ার সময় বিগত ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি  আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিল করেন। যার সদস্য নং ১৩৯৫। 


ফিরোজ তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এলাকাবাসীর কাছে ‘ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসাবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন। তার এসব প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড ও  মিথ্যা-জালজালিয়াতির তথ্য দিয়ে চাকরিতে বহাল থাকায় রাষ্ট্রের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। যা ফৌজদারি অপরাধের শামিল বলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়।

অভিযোগকারী জানান, ২০২৩ সালের মার্চে এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে জেলা প্রশাসক বরাবরে এ বিষয়ে অভিযোগ দিলেও অজ্ঞাত কারনে তদন্ত হয়নি। পরবর্তীতে গত ১৪ অক্টোবর অভিযোগকারী নিজেই সাবেক জেলা প্রশাসক তানভীর আহমেদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে লিখিত অভিযোগ দেন। এসময় জেলা প্রশাসক এডিসিকে (সার্বিক) অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল ওয়ারেছ আনসারীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাজিয়া সুলতানা  তদন্ত করছেন এবং অভিযুক্ত পিয়ন ফিরোজকে কাগজপত্রসহ জবাব দাখিলের জন্য নোটিশ করা হয়েছে।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অভিযোগ পেয়েছি। ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (সার্বিক) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত ফিরোজের কাছে জাল জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এসব অভিযোগ মিথ্যা।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অপরাধ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝