রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জমে উঠেছে রাজধানীর পশুর হাট, দাম বাড়িয়েছে পিকআপ ভাড়া
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ জুন, ২০২৫, ৮:০৭ পিএম   (ভিজিট : ২৯৫)
X

দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের সর্ববৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসবে পশু কোরবানি করেন সামর্থ্যবানরা। ঢাকার কোরবানির হাটগুলোতে এখন চলছে কেনাবেচার চূড়ান্ত ব্যস্ততা। সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ অফিসে ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় হাটগুলোতে ক্রেতারা ভিড় জমাচ্ছেন। দুপুরের পর থেকে পুরোপুরি জমে উঠছে সব হাট। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত দুই দিনের তুলনায় আজ পশু বিক্রি বেড়েছে। বড় গরুর তুলনায় ছোট গরুর চাহিদা বেশি। দামও এখন কিছুটা বেশি। ক্রেতারা দরদাম করে গরু নিচ্ছেন।

বুধবার (৪ জুন) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে সরেজমিনে ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নির্ধারিত গেট পেরিয়ে পাশে ইট-বালুর মাঠ ও সড়ক পর্যন্ত ত্রিপল টাঙিয়ে রাখা হয়েছে পশু। ভেতরে এবং বাইরে দুই স্থানেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গরু বাছাই করে যাচ্ছেন ক্রেতারা। কেউ পছন্দ করে কিনে ফেলছেন, কেউ আবার দাম যাচাই করে ফিরে যাচ্ছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে এবার চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ গরু এসেছে। গাবতলী হাটে কর্মরত একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় পাঁচশোর বেশি গরু হাটে প্রবেশ করেছে। তবে পশুর আমদানি বেড়েছে বলেই দাম যে কমেছে, এমন নয়। খামারিরা বলছেন, খরচ এত বেড়েছে যে গরুর দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

এবার হাটে গরুর সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক হলেও দাম অনেকটাই ‘চড়া’ বলে মন্তব্য করেছেন বেশিরভাগ ক্রেতা। ছোট আকারের গরুর দাম শুরু হচ্ছে ৭০-৮০ হাজার টাকা থেকে। মাঝারি গরু বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে। বড় গরু ৩ লাখ থেকে শুরু করে ৬-৭ লাখ টাকাও হাঁকা হচ্ছে।

গাবতলী হাটে দেখা মিলল বাড্ডা থেকে আসা একটি পরিবারের। তাদের মধ্যে শাহীন হোসেন নামক একজন জানান, দুইটা মাঝারি গরু দেখেছি। একটা ১ লাখ ৫০, আরেকটা ১ লাখ ৮০ চাচ্ছে। গতবার এই সাইজের গরু ১ লাখ ২০ হাজারের মধ্যে পেয়ে গিয়েছিলাম। দাম একটু বেশি হলেও পশুগুলোর মান ভালো, তাই ভেবে দেখছি।

ক্রেতাদের অভিযোগ, হাট থেকে পশু বাড়ি নেওয়ার খরচ এখন আকাশছোঁয়া। বিশেষ করে পিকআপ ভাড়া অতীতের তুলনায় অনেক বেশি।মিরপুরের বাসিন্দা আজিজুর রহমান বললেন, একটা মাঝারি গরু কিনেছি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায়। গাবতলী থেকে ডেমরায় নিতে ৫ হাজার টাকা চাইছে। ৩ হাজারে রাজি করিয়েছি। কিন্তু এই খরচটাও অনেক।

বিক্রেতারা বলছেন, এবারের কোরবানির হাটে ক্রেতাদের মধ্যে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ১০ থেকে ১৮ মনের গরু বেশি বিক্রি হচ্ছে। তাদের দাবি, বর্তমান বাজারে ৬ থেকে ৮ মনের গরু আনুমানিক ২৪০-৩২০ টাকা কেজিতে ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও ১০-১২ মনের গরু ৪০০-৪৮০ টাকা কেজিতে আনুমানিক দেড় থেকে দুই লাখের মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও ১৫ থেকে ১৮ মনের গরু ৬০০ থেকে ৭২০ টাকা কেজিতে দুই লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ ৮০ হাজার পর্যন্ত কেনাবেচা হচ্ছে। তবে ২০ মনের অধিক গরু ৮০০ টাকা কেজিতে সাড়ে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখে (কম চাহিদা) বিক্রি হচ্ছে।

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর গাবতলী, শ্যামপুর ও শনির আখড়ার হাটগুলোতে পশুর সরবরাহ থাকলেও দাম ও বিক্রির বিষয়ে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের গরু তুলনামূলক ভালো দামে বিক্রি হলেও বড় গরুর ক্রয়-বিক্রয়ে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নরসিংদী থেকে গরু নিয়ে আসা খামারি মো. বাশার আলী বলেন, আমি ৮টা ছোট গরু এনেছি। এর মধ্যে ৬টা বিক্রি হয়ে গেছে। ৮০ থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি করেছি। ছোট গরুর চাহিদা বেশি, কারণ ঢাকায় অনেকে বাসায় রাখার জায়গার অভাবে বড় গরু কিনতে চায় না।

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সিরাজগঞ্জের খামারি আমিনুল ইসলাম বলছিলেন, আমি মাঝারি-বড় মিলিয়ে ১০টা গরু এনেছি। এখনও ৭টা পড়ে আছে। দাম চাইলেই ক্রেতারা কেবল দেখে চলে যাচ্ছে। আমার একটার ওজন প্রায় ২০ মণ, দাম বলেছি ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তারা বলছে ১ লাখ ৮০ হাজার— এইভাবে তো বিক্রি করা সম্ভব না।

তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতি বছরই দেখি, ঢাকায় মানুষ গরু কেনে শেষ সময়ে। এখন যারা হাটে আসছে, তারা শুধু দেখে যাচ্ছেন কিংবা ছোট গরু কিনছেন। বড় গরুর ক্রেতারা এখনও মাঠে নামেননি। আমরা ধরে নিচ্ছি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মূল ক্রেতারাই হাটে আসবেন। তখন বিক্রিও দ্বিগুণ হবে, দামও কিছুটা বাড়বে।

পিকআপ ভাড়া দেখলে মাথা ঘুরে যায়, বলছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা

রাজধানীর গাবতলী থেকে পশু কিনে ফেরার পথে দেখা হয় জাহিদুল ইসলাম নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি একটি মাঝারি আকারের গরু কিনেছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকায়। কিন্তু গরুর দাম নিয়ে সন্তুষ্ট হলেও পিকআপ ভাড়ায় ক্ষোভের কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, গরুটা মোটামুটি পছন্দের মধ্যে ছিল, দরদাম মিলিয়ে কিনেও ফেললাম। কিন্তু এটিকে বাসায় নিতে গিয়ে দেখি মাত্র ৫ কিলোমিটারের পথের জন্য পিকআপ ভাড়া ৫ হাজার টাকা। গত বছর এই একই পথে ২ হাজার ৫০০ টাকায় গরু নিয়েছি।

তিনি আরও যোগ করেন, এটা তো একরকম ডাকাতি। পিকআপের সংখ্যাও কম, তাই দর-কষাকষি করেও লাভ হচ্ছে না। আমাদেরও তো বিকল্প নেই। এভাবে যদি বাড়তি খরচ যোগ হয়, তাহলে গরুর দাম কম হলেও ঈদের বাজেট পড়ে যায় চাপে।

পিকআপ ভাড়া নিয়ে আক্ষেপ বিক্রেতাদেরও। রফিকুল ইসলাম নামের একজন খামারি এসেছেন মেহেরপুর থেকে। গাবতলী হাটে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি এবার হাটে এনেছেন মোট ২০টি গরু। এর মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৫টি। রফিকুল বলেন, আমার সবচেয়ে সস্তা গরুটাই ৯২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি সাইজের দুইটা গেছে ১ লাখ ৩০-৩৫ হাজার টাকায়। কিন্তু বড় গরুগুলোর দিকে এখনও মানুষ আগায় না। ঢাকার মানুষ সাধারণত ঈদের দুই দিন আগে গরু কেনে, এখন যারা আসছেন, তারা দেখে যাচ্ছেন বা ছোট গরু কিনছেন।

পশু পরিবহনে বাড়তি খরচের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা গ্রাম থেকে আসি ট্রাকে। এবার শুধু এক ট্রিপ ট্রাক ভাড়া লেগেছে ৭০ হাজার টাকা। খাবার, হেলপারদের খরচ, ট্রাকভাড়া মিলিয়ে গড়ে প্রতিটি গরুর পেছনে ২০-২৫ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাচ্ছে দাম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বেশিরভাগ হাটেই সিসিটিভি, মেডিকেল টিম, ভেটেরিনারি সেবা, মাইকিং, মল-মূত্র ব্যবস্থাপনা কিছুটা উন্নত হলেও গতকালের বৃষ্টির কারণে হাটের অনেক স্থানে কাদা জমেছে। বিশেষ করে গাবতলী হাটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েরই ভোগান্তি হচ্ছে।

এ বিষয়ে হাটের ইজারাদার তারেক ইসলাম বলেন, হাট ইজারা নিতে ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা গুনেছি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্যাট, জামানত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ। পুরো হাটজুড়ে ৬০টি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে, রয়েছে তিনটি ব্যাংকের বুথ, মেডিকেল টিম, পশুর চিকিৎসক, নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক দল।

ইজারাদার প্রতিনিধি কে এম ইয়াহিয়া সামি জানান, হাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী আলাদা ক্যাম্প স্থাপন করেছে। পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব, আনসার সদস্যদের জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাল টাকা শনাক্তের মেশিন এবং চিকিৎসক দলও রয়েছে।

ঈদের বাকি আর মাত্র কয়েক দিন। ঢাকার হাটগুলোতে পশুর আমদানি ঠিক থাকলেও দাম ও পরিবহন খরচের কারণে অনেকেই ক্রয় সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। তবে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, শেষ মুহূর্তে হাট জমবে, বিক্রি বাড়বে এবং এবারের ঈদেও কোরবানির পশুর বাজার শেষ হাসি হাসবে।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝