উত্তরের নদ-নদীতে ধরা পড়ছে ইলিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক

‘মা’ ইলিশ সংরক্ষণ ও প্রজনন নিশ্চিতের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ইলিশ ধরা, বাজারজাত ও ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে সরকার। এছাড়া ২০০৩-০৪ সাল থেকে জাটকা রক্ষার কর্মসূচি শুরু হওয়ায় আগের তুলনায় ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছর ইলিশ আহরণের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় আরও বাড়বে বলে আশা করছেন মৎস্য সংশ্লিষ্টরা। আর এরই ধারাবাহিকতায় রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ১১টি উপজেলায় ইলিশ ধরা পড়ছে। ইলিশ দক্ষিণাঞ্চলের মাছ হলেও এখন উত্তরের নদ-নদীতে দুর্লভ এ মাছ পেয়ে জেলেরা খুশিতে উচ্ছ্বসিত।
মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, মাঝেমধ্যেই উত্তরের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় ইলিশ মাছের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব নদীগুলোর নাব্যতা সংকটই বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাছ ধরার ক্ষেত্রে। এছাড়া জেলেদের কারিগরি সহায়তার সংকট থাকায় তেমনভাবে মাছ ধরতে পারছেন না। বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়ে লিখেছি বলে জানিয়েছেন, কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার ১১টি উপজেলায় ধরা পড়ছে ইলিশ। গত মৌসুমে ৪৮ টন ইলিশ ধরা পড়েছে। গত ২৯ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় জেলেরা ইলিশ ধরতে নদীতে যাচ্ছেন। তবে নৌকা সংকটে অনেক জেলে নদীতে যেতে পারছেন না। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পারলে রংপুর অঞ্চলের নদ-নদীগুলো ইলিশের অভয়াশ্রম হতে পারে। ইলিশকে ঘিরে মৎস্যখাতে দেখা দিতে পারে নতুন সম্ভবনার দুয়ার।
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এক সময় ইলিশ বলতে মনে করা হতো এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মাছ। এ ধারণা পল্টে দিয়ে লালমনিরহাটের ১টি, কুড়িগ্রামের ৬টি উপজেলা এবং গাইবান্ধা জেলার ৪টি উপজেলায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। কুুড়িগ্রামের সদর, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর এবং গাইবান্ধা জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার ব্রক্ষ্মপুত্র ও তিস্তা নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।
তবে দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় পরিমাণ কম। প্রতি বছর এ তিন জেলায় ৫০-৬০ টন ইলিশ পাওয়া যায়। সম্প্রতি ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশের মতো ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল এ তিন জেলায়ও। এ সময় ১ হাজার ৬শ’ জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ-সাত বছর আগেও তিস্তা নদীর গঙ্গাচড়া মহিপুর এলাকায় ইলিশ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন তিস্তায় ইলিশ তেমন একটা পাওয়া যায় না।
ইলিশ না পাওয়ার বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত মৎস্য জরিপ কর্মকর্তা জুবায়ের আলী বাসসকে বলেন, ইলিশ মূলত সাগরের মাছ। যেসব নদীর সঙ্গে সাগরের যোগ আছে সেসব নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়। রংপুর অঞ্চলে বর্ষাকালে ব্রক্ষ্মপুত্র খরস্রোতা হয়ে থাকে, তাই ওই সময় ব্রক্ষ্মপুত্রে ইলিশ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, এক সময় তিস্তা খরস্রোতা ছিল। সাগর থেকে তিস্তাতেও ইলিশ আসত ডিম পাড়তে। এ অঞ্চলে ইলিশের আগমন ঘটাতে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। নদীগুলোকে খরস্রোতা করতে পারলেই দেশের অন্যান্য জেলার মতো এখানকার নদীতে ইলিশ পাওয়া যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উলিপুরের মাঝিপাড়া এলাকার মৎস্যচাষি নয়ন চন্দ্র বাসসকে বলেন, ‘এ মৌসুমে ইলিশ মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। ব্রক্ষ্মপুত্রে ১ কেজি ওজনের ইলিশ পাইকারি ১২শ’-১৩শ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। নিষেধাজ্ঞার সময় প্রণোদনা হিসেবে ২৫ কেজি চাল পেয়েছেন তিনি।’
কুড়িগ্রামের জেলে কাঞ্চন কুমার বলেন, ‘জেলেদের মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা কমে গেছে। ফলে জেলেরা আগের মতো মাছ ধরতে যেতে পারে না। তাদের কমপক্ষে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া নৌকা ভাড়া রয়েছে। যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যায় তা দিয়ে পোষায় না। ফলে অনেক সময় ইলিশ ধরা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, ব্রক্ষ্মপুত্রের আধা কেজি ওজনের নিচের ইলিশ ৫শ’-৬শ’ টাকা, এর বড় সাইজগুলো ১২শ’-১৪শ’ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কালীপূজা পর্যন্ত নদীতে ইলিশ পাওয়া যাবে। এর পরে হাতে গোনা দুই-একটি ইলিশ পাওয়া যাবে। ’
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের জেলে আব্দুল গনি বাসসকে বলেন, চলতি বছরে তারা তিস্তা থেকে ১৫ কেজি ইলিশ মাছ ধরেছেন। নৌকার সংকট থাকায় তারা মাছ ধরতে পারছেন না। এছাড়া তিস্তার নাব্যতা সংকটও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাহাদত হোসেন বাসসকে বলেন, ‘রাজীবপুর ও রৌমারী উপজেলার চেয়ে তার উপজেলায় ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে।’
রংপুর মৎস্য অধিদপ্তররের অতিরিক্ত পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার ১১টি উপজেলায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের ইলিশ নিধন বন্ধ কার্যক্রমের সময় ১ হাজার ৬শ’ জেলেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পারলে এ অঞ্চলে ইলিশের অপার সম্ভাবনা দেখা দেবে।
তিনি আরো বলেন, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর নাব্যতা সংকটের জন্য ইলিশসহ অন্যান্য মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের প্রচেষ্টা রয়েছে শীঘ্রই তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র খনন করা হবে। যদি খনন করা হয় তাহলে ইলিশসহ দেশীয় অন্যান্য মাছের কোনই সমস্যা হবে না এ অঞ্চলে।
আ.দৈ/এসআর




















