সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৬ আশ্বিন ১৪৩৩
ই-পেপার

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তন
শরতে বদলে যাচ্ছে আবহাওয়ার চেনা ছন্দ, বাড়ছে গরমের দাপট
শাহীন রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৪ পিএম   (ভিজিট : ০)
X

শরৎ মানেই নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর বৃষ্টির দাপট কমে আসার স্বস্তি—বাংলাদেশের মানুষের কাছে ঋতুটির এমনই পরিচিত ছবি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শরতের সেই চেনা আবহাওয়ার ছন্দ যেন বদলে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসেও অনেক এলাকায় তীব্র গরম, ভ্যাপসা অস্বস্তি, রাতেও তাপমাত্রা কম না থাকা এবং হঠাৎ ভারী বৃষ্টির প্রবণতা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—বাংলাদেশের শরৎ 

কি আগের মতো নেই?
ঋতু বৈচিত্রের ধরন অনুযায়ি একমাস পরেই তাপমাত্রা কমে ধীরে ধীরে প্রকৃতিতে শীতলতা নেমে আসবে। কিন্তু তার আগে এই এই দু;সহ গরম জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে বর্ষা বিদায়ের শেষ সময়ে এসে বৃষ্টিপাত কমে তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। শুধু এবার নয় গত চার বছর ধরেই সেপ্টেম্ববে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন শরতের আবহাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এ সময়ে দিনে গরম পড়বে এটা স্বাভাবিক; কিন্তু রাতে ধারাবাহিকভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির অর্থ হলো উষ্ণায়ন দীর্ঘস্থায়ী হওয়া, নগর তাপদ্বীপ সৃষ্টির হুমকি, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। এই প্রবণতা বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এবারের অতিরিক্ত গরমের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মৌসুমি বায়ুর আচরণ, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, বাতাসে জলীয়বাষ্প, স্থানীয় আবহাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণতা—সব মিলিয়েই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শুরু ও মাঝামাঝি সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত এবং মৌসুমি বায়ুর তুলনামূলক দুর্বল সক্রিয়তা তাপমাত্রা বাড়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসেও সেপ্টেম্বর মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। একই সময়ে দেশের কিছু অঞ্চলে মৃদু তাপপ্রবাহের পরিস্থিতিও তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বৃষ্টিপাত কমে গেলে মাটি ও পরিবেশের ওপর বৃষ্টির শীতল প্রভাব কমে যায়। অন্যদিকে দিনের তাপ রাত পর্যন্ত ধরে রাখায় রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি অনুভূত হয়। ফলে দিনের গরমের সঙ্গে যোগ হচ্ছে রাতের ভ্যাপসা অস্বস্তি।

তারা বলছেন এবারের আবহাওয়ার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তীব্র গরমের পাশাপাশি হঠাৎ ভারী বৃষ্টি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ঢাকায় অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ঘটনাও ঘটেছে। আবহাওয়াবিদদের ব্যাখ্যায়, মৌসুমি বায়ু কখনো দুর্বল, আবার হঠাৎ সক্রিয় হয়ে পড়ায় এমন বৈপরীত্য দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ শরৎকালে একদিকে তাপমাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনাও ঘটছে।

তবে এবারের গরমকে শুধু সাময়িক আবহাওয়াগত পরিবর্তন দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বলছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণ দিন যেমন বাড়ছে, তেমনি চরম গরমের ঘটনাও আগের তুলনায় বেশি ঘন ঘন ঘটছে। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত জুন থেকে আগস্ট সময়ে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন সেপ্টেম্বরের গরম দেশে একেবারে নতুন ঘটনা নয়। অতীতেও শরৎকালে অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড রয়েছে। বিভিন্ন বছরে সেপ্টেম্বর মাসে দেশের কয়েকটি জেলায় ৩৭-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা উঠেছে। ফলে এবারের গরমকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বলার সুযোগ নেই। বরং বিশেষজ্ঞদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—এ ধরনের উষ্ণ পরিস্থিতি কত ঘন ঘন তৈরি হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রবণতা কোন দিকে যাচ্ছে।

জলবায়ু গবেষকদের কাছে এখানেই বড় উদ্বেগ। একটি উষ্ণ পৃথিবীতে শুধু গড় তাপমাত্রাই বাড়ে না; বৃষ্টির সময়, তীব্রতা এবং তাপমাত্রার ওঠানামাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে আগে যে সময়ে টানা বৃষ্টি বা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া পাওয়া যেত, সেই সময়েই এখন তীব্র গরম দেখা দিতে পারে। আবার অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিও হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এর প্রভাবও বহুমাত্রিক। অতিরিক্ত গরমে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষমতা ব্যাহত হয়। শহরে কংক্রিটের তাপ, যানবাহন ও অপর্যাপ্ত সবুজের কারণে অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি হতে পারে। কৃষিক্ষেত্রে তাপমাত্রা ও বৃষ্টির পরিবর্তন ফসলের সময়সূচি ও উৎপাদন ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

তবে একটি বা কয়েকটি উষ্ণ সেপ্টেম্বর দিয়েই জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। এর জন্য বহু বছরের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা ও মৌসুমি বায়ুর তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কিন্তু পর্যবেক্ষণগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করছে—বাংলাদেশের ঋতুচক্রে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তনের লক্ষণ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। শরতের চেনা নীল আকাশ তাই এবারও দেখা যাচ্ছে, সাদা মেঘও আছে; কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গরমের তীব্রতা। প্রকৃতির এই বৈপরীত্য হয়তো শুধু একটি ঋতুর সাময়িক বৈশিষ্ট্য নয়—দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ছবিরই একটি অংশ।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝