হামের উপসর্গে আরও ৭ মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা ছাড়াল এক হাজার
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে হামের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯ জন। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত নিয়মিত হাম পরিস্থিতির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া সাতজনের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের। এ ছাড়া সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। তবে এ সময়ে নিশ্চিত হামে নতুন কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৯০৯ জন। আর পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৯। হামের সংক্রমণের পাশাপাশি উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ১৬৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫।
একই সময়ে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৯ জনের শরীরে। এ নিয়ে চলতি প্রাদুর্ভাবে নিশ্চিত হাম রোগীর মোট সংখ্যা ১৯ হাজার ৯৩৩। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও বড় আকার ধারণ করেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে আক্রান্ত ও মৃতদের বয়সভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে রোগতত্ত্ববিদদের মতে, হাম যেকোনো বয়সে হতে পারে, কিন্তু শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। চলমান প্রাদুর্ভাবের সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব মৃত্যু হচ্ছে, সেগুলোও পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র বোঝাতে হামে মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা হাম এবার বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ২০২৫ সালে শিশুদের হাম প্রতিরোধী টিকাদানে ঘাটতি এবং পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিলম্ব সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, হামের পরিস্থিতি অবনতির পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অবহেলা ভূমিকা রেখেছে। তাঁর ভাষ্য, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ পরিকল্পনা না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতেই হাম ছড়াতে শুরু করলেও শুরুতে তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। মার্চে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। তবে ওই কর্মসূচিতেও প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। বাংলাদেশে এ বছরের হাম পরিস্থিতি আগের কয়েক বছরের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নিশ্চিত হাম রোগী ছিল ১৩২ জন। এর আগের তিন বছরে এই সংখ্যা ছিল ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১।
রোগতত্ত্ববিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, দেশে এর আগে হামে এত বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু তিনি দেখেননি। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশুরা। জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারীর ভাষ্য, বিভিন্ন দেশের মধ্যে চলতি বছর বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এত বড় আকারের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নজিরবিহীন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফলে টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে হাম পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
আ.দৈ/এসআর




















