শিগগিরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল, রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের প্রশিক্ষণ শুরু করেছে পুলিশ। যেসব সদস্য এর আগে কোনো নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেননি, তাঁদের দ্রুত প্রশিক্ষণের আওতায় আনার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন অনুরোধ জানানোর প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই এই কার্যক্রম শুরু হলো।
বুধবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে সিইসি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল খুব শিগগিরই ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি, সব রেঞ্জের ডিআইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত ডিআইজি, ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একসঙ্গে উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন সিইসি।
সিইসি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। নির্বাচন আয়োজন করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব। একইভাবে কমিশনকে সহযোগিতা করে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাহিনীগুলোর দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ‘ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবল’ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতিশ্রুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। নির্বাচনের সময় কমিশন থেকে কোনো বেআইনি নির্দেশনা দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
পুলিশের পক্ষ থেকেও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলে মন্তব্য করেন সিইসি। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলই প্রমাণ করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়িত্ব কতটা সফলভাবে পালন করেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও পুলিশের প্রতি মানুষের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই দূর হয়েছে। এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই ধরনের সক্ষমতা দেখানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে পুলিশের কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন সিইসি। বিশেষ করে যানবাহনের সংকট রয়েছে বলে জানান তিনি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার সময় পুলিশের অনেক গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত ও পুড়ে যায়। এর সবগুলো এখনো প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচনী প্রশিক্ষণে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয় হবে জানিয়ে সিইসি বলেন, আপাতত পুলিশের নিজস্ব প্রশিক্ষণ তহবিল থেকেই এ ব্যয় বহনের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে এই ব্যয় তাদের জন্য কিছুটা চাপের হওয়ায় অতিরিক্ত তহবিলের প্রয়োজন রয়েছে।
পর্যায়ক্রমে বিজিবি ও আনসার সদস্যদেরও নির্বাচনী প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে বলে জানান সিইসি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে অতীতের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করেন সিইসি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি পরিবর্তিত হবে এবং পুলিশের ওপর তাঁর আস্থা রয়েছে। পুলিশ সঠিকভাবে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কাজ করলে এবং কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা না দিলে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
স্থানীয় নির্বাচনে সহিংসতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে বলেও উল্লেখ করেন সিইসি। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি থাকে এবং অনেক সময় একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফলে গ্রাম ও স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ, সংঘাত ও মারামারির ঘটনা ঘটতে পারে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। ভোটকেন্দ্র ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নজরদারিতে সিসিটিভি, বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ডিজিটাল ও অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে মাঠের পরিস্থিতি রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
তফসিল ঘোষণার বিষয়ে সিইসি বলেন, প্রস্তুতি শেষ হলেই নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে তফসিল ঘোষণা করবে। কোনো অনুষ্ঠানে বসে তফসিল ঘোষণা করা হবে না।
তিনি আরও জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক বা দলীয় পদে হবে না। আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী অংশ নিতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচনে কারা যোগ্য আর কারা অযোগ্য, তা আইনেই নির্ধারিত রয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় যাঁরা আইন অনুযায়ী যোগ্য, তাঁরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। আর আইনি বাধা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও প্রস্তুতি চলছে বলে জানান সিইসি। তবে এই নির্বাচন কখন অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। সব বিষয় পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হবে। তবে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্যই নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি রাখছে।
এদিকে দলীয় সরকারের অধীনে পুলিশ চাপমুক্তভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, বর্তমান সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার। নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ইতিবাচক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ কাজ করবে।
আ.দৈ/এসআর




















