ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে চালু হচ্ছে কিউআর কোড
থাকছে আলাদা রুট, মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে চলবে না
নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক উচ্ছেদ না করে এবার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব যানকে নির্দিষ্ট রুটে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি নিবন্ধিত যানকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে যুক্ত করা হবে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ও কিউআর কোড। একই নিবন্ধন ব্যবহার করে একাধিক যান চালানোর সুযোগও বন্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খাতের সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই একদিকে মানুষের জীবিকা অক্ষুণ্ন রাখা, অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষা—দুই বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সরকার নতুন বিধিমালা ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
নতুন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল হবে নির্দিষ্ট রুটভিত্তিক। মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল করতে পারবে না। কোন এলাকায় কোন রুটে অটোরিকশা চলবে, তা নির্ধারণের মাধ্যমে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেই ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত বিধিমালা ও নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে এতদিন অনেকটা অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলা ব্যাটারিচালিত যানগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খাতে দীর্ঘদিনের একটি অনিয়মের কথাও সংসদে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, অতীতে একটি গাড়ির নিবন্ধন ব্যবহার করে একই নম্বরে ১০ থেকে ২০টি পর্যন্ত যান চালানোর ঘটনা দেখা গেছে। এই জালিয়াতি বন্ধ করতে প্রতিটি যানকে ডিজিটালভাবে শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিবন্ধিত প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড যুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে গাড়িটির নিবন্ধন ও পরিচয় দ্রুত যাচাই করা যাবে। সরকারের ধারণা, ডিজিটাল শনাক্তকরণ চালু হলে একই নিবন্ধন ব্যবহার করে একাধিক যান পরিচালনা, ভুয়া পরিচয় এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
শুধু রুট ও নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ নয়, অটোরিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপত্তার বিষয়টিও নতুন নীতিমালায় গুরুত্ব পেয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবহারের শর্ত থাকবে। বর্তমানে ব্যবহৃত সস্তা লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যবহৃত ব্যাটারি কীভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়টি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাটারিচালিত যান বাড়ার সঙ্গে অবৈধ চার্জিং স্টেশনের বিস্তার নিয়েও সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশে দাবি করেন, দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশা চলছে। এসব যান মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার হলেও শুধু ঢাকাতেই অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি। অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার বলেও সংসদে দাবি করেন তিনি। বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিভাগের নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কারণ হিসেবে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এসেছে। সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ ব্রেকসহ বিভিন্ন কারণে এসব যান দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি ২০২৫ সালের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬ হাজার ১১১ জনের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ অটোরিকশা দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা এসব যানকে ঘিরে থাকায় এগুলোকে একসঙ্গে উচ্ছেদ বা ডাম্পিং না করে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার পক্ষে মত দেন তিনি।
ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু সড়কে এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ঢাকার বিভিন্ন ট্রাফিক সিগন্যালে ইতোমধ্যে এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।
সরকারের নতুন উদ্যোগে মূলত দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে—ব্যাটারিচালিত যান থেকে মানুষের কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে সড়ক ও পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব কমানো। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে নীতিমালার বাস্তবায়ন। নির্দিষ্ট রুট ঠিকভাবে কার্যকর করা, প্রতিটি যানকে সঠিকভাবে নিবন্ধনের আওতায় আনা, কিউআর কোডের অপব্যবহার ঠেকানো, নিরাপদ ব্যাটারি নিশ্চিত করা এবং অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট বন্ধ করা—সবকিছু একসঙ্গে করতে না পারলে নতুন নীতিমালার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
আ.দৈ/এসআর




















