সংসদে প্রধানমন্ত্রী
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের পাঁচ কর্মপরিকল্পনা
নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা: দীর্ঘদিনের গ্যাস অনুসন্ধানের ঘাটতি ও আমদানিনির্ভরতার কারণে তৈরি জ্বালানি সংকট কাটাতে পাঁচ দফা সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, নতুন সাইসমিক জরিপ, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা, স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।
বুধবার জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার লিখিত প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব পরিকল্পনার কথা জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিষয়টি উত্থাপিত হয়।
বাড়ানো হবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন
সরকারের প্রথম লক্ষ্য দেশের নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো। এ জন্য ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে আরও সাতটি কূপের খননকাজ চলছে। এগুলো শেষ হলে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করছে সরকার। অবশিষ্ট কূপগুলোর জন্য পর্যায়ক্রমে নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে।
গ্যাসের নতুন উৎস খুঁজতে সাইসমিক জরিপ
দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে গ্যাসের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করতে বড় পরিসরে সাইসমিক জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এ কর্মসূচির আওতায় ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হবে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব জরিপের মাধ্যমে নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন রিগ
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড—বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আরও দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। নতুন রিগ যুক্ত হলে কূপ খনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।
অফশোর-অনশোর অনুসন্ধানে নতুন বিডিং
সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসির আওতায় কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ অনুমোদনের পর ইতোমধ্যে বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও চলছে। সরকারের মতে, অফশোর ও অনশোর অনুসন্ধানে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাড়বে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা
জ্বালানি সংকট সামাল দিতে আমদানিনির্ভর গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এই টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। এতে আগামী দুই বছরে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা দৈনিক আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়বে বলে আশা করছে সরকার। এর পাশাপাশি পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে আরও এক বা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও গুরুত্ব
জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রয়োজনীয় সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারিসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর শর্তসাপেক্ষে কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর ও অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তাদের গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কেনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় গড়ে ৬ থেকে ৭ টাকা ধরে এতে উদ্যোক্তাদের জন্য মুনাফার সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি পানি, বায়ু ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে সংসদে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে একদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান বাড়বে, অন্যদিকে আমদানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আ.দৈ/এসআর




















