রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না: রাষ্ট্রপতি
নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৪:১৪ পিএম   (ভিজিট : ২৮)
X

এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর । তিনি বলেছেন, কোনো মাকে সন্তানের জন্য কিংবা কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধী সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে।

আজ রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি একথা বলেন। গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য, সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ৩০ আগস্ট এমন একটি দিন, যা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করার পাশাপাশি তাদের স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা, বেদনা ও অনিশ্চয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সন্তান ও স্বজনের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন এবং প্রিয়জনদের কথা স্মরণ করে তিনি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা জানান।

গুমকে সাধারণ অপরাধ নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, গুম শুধু একজন মানুষকে কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক-সামাজিক স্থিতি। এটি একটি জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু গুমের মাধ্যমে কার্যত এসব অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করা হয়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করলেই অনেককে তুলে নিয়ে যাওয়া, গুম করা এবং গোপনে হত্যা করা হয়েছে।তার ভাষ্য, ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গুরুতর অপরাধ সবসময় অস্বীকার করে গেছে।

তিনি বলেন, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অসংখ্য মানুষের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তাদের পরিবারের প্রতিটি রাত বুকভরা বেদনা, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে কেটেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

 রাষ্ট্রপতি আরো উল্লেখ করেন, গুমের শিকার আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ ভিন্ন মতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিকদের বছরের পর বছর অন্ধকার, দমবন্ধ, আলো-বাতাসহীন ‘আয়নাঘরে’ আটকে রাখা হয়েছিল বলেও ।

তিনি বলেন, মঞ্চে উপবিষ্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে সমাজের মাঝে ফিরে এসেছেন। তবে দেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন, যারা এখনো ফিরে আসেননি।

‘ প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালে গণতন্ত্র, সাম্য, বাক্‌স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন। অথচ সেই স্বাধীন দেশেই গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত অন্যায় ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে একটি ভয়ানক ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। জাতীয় ইতিহাসে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তাদের অনেকেই গুম-খুনের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন:
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত।
নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং বেছে বেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে এসব বর্বর, পৈশাচিক ও ঘৃণ্য কাজ বেশি করা হয়েছিল এমন বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।

তবে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করলেও পথ এখনো অনেক দীর্ঘ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গুম প্রতিরোধে নতুন উদ্যোগ
এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ভুক্তভোগী আগে, এখনই পদক্ষেপ’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারকে রক্ষা এবং গুমকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কাজ স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করা পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।

‘রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে’
রাষ্ট্রপতি বলেন, তারা এমন একটি বাংলাদেশ চান, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

রাষ্ট্রপতির মতে, একটি দেশের উন্নয়ন ও সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করেন তা রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতেই তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ বিষয়ে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তিনি এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান, যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি; সুশাসন হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি; জবাবদিহিতা ও বাক্‌স্বাধীনতা হবে গণতন্ত্রের শক্তি এবং ইনসাফ হবে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।

গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার আলোকিত পথে এগিয়ে যাবে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানান রাষ্ট্রপতি।

আ. দৈ./একে


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝