সরকারের ছয় মাসে সিপিডির মূল্যায়ণ
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর গতি প্রত্যাশার চেয়ে কম
৩১ সূচকের ১৯টিতে অবনতি, স্বস্তি ১২টিতে

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মূল্যায়নে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে পর্যবেক্ষণ করা ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে। বিপরীতে ১২টি সূচকে কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেলেও সেগুলোর বেশিরভাগই এখনো টেকসই অবস্থানে পৌঁছায়নি। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হলেও তা নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই বলে মনে করছে সিপিডি।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মূল পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন। সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে ৯টি খাতের ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করেছে সিপিডি। এর আওতায় ছিল শাসন ও প্রশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা। সিপিডি জানিয়েছে, শুধু সরকারি ঘোষণা নয়, বাস্তবে নেওয়া পদক্ষেপকেই এই মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
অর্থনীতিতে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তি বেশি
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ছয় মাসের মূল্যায়নে এই দুই ক্ষেত্রেই আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়ই একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছিল। অর্থের সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, অনাদায়ী ঋণ, অর্থপাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় চ্যালেঞ্জ আগে থেকেই ছিল। তবে এসব সমস্যা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সরকারের কার্যক্রমে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি।
সিপিডির হিসাবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমেছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নতুন বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট ও বাজারের অস্থিতিশীলতার মতো সমস্যাগুলো ছিল, ছয় মাস পরও সেগুলোর পুরোপুরি সমাধান হয়নি বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ
সিপিডির মূল্যায়নে মূল্যস্ফীতি এখনো অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগের জায়গা। এর সঙ্গে মাথাপিছু ঋণের চাপ এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতাও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও সেগুলোকে এখনই স্থায়ী পুনরুদ্ধারের লক্ষণ হিসেবে দেখছে না সিপিডি। সংস্থাটির মতে, অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে আরও কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সুশাসনেও প্রশ্ন
অর্থনীতির পাশাপাশি সুশাসনের ক্ষেত্রেও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট এবং ‘মব কালচার’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি। সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করার পরও মব সহিংসতা অব্যাহত থাকার বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ ও পদায়নের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন সিপিডির এই অর্থনীতিবিদ।
বেতন কাঠামো নিয়েও সমালোচনা
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না। তিনি মনে করেন, বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং সময় যত গড়াবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে। তার মতে, শুরুতেই যদি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সময় নেওয়া হতো, সেটি তুলনামূলকভাবে ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারত। বেতন কাঠামোর বিষয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে থাকলে সরকারের অন্যান্য কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানসহ অন্য গবেষকেরা অংশ নেন।
আ.দৈ/এসআর




















