রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণা
লবণাক্ত পানিতে উপকূলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে
খাবার পানির উৎসের ৫৫ শতাংশই লবণাক্ত কয়রায়, হৃদরোগের ঝুঁকিতে প্রতি পাঁচজনে একজন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৮ পিএম   (ভিজিট : ৩২)
X

উপকূলীয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য লবণাক্ততা শুধু নিরাপদ পানির সংকট নয়, এটি ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতেও। খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকার খাবার পানির উল্লেখযোগ্য অংশে লবণাক্ততা রয়েছে। একই সঙ্গে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের একটি বড় অংশ আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

সোমবার (২৪ আগস্ট) আইসিডিডিআর,বি’র সভাকক্ষ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য: প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী এক দশকে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি) হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ, উপকূলীয় এই জনগোষ্ঠীর প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন হৃদ্রোগের উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে কয়রায় এই ঝুঁকি ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ, আর আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

আইসিডিডিআর,বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণাটিতে মূলত উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির লবণাক্ততা এবং এর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণার আওতায় খুলনার কয়রা উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রাম এবং তুলনামূলক এলাকা হিসেবে সাতক্ষীরার আশাশুনির বিভিন্ন পানির উৎস জরিপ করা হয়। সব মিলিয়ে গবেষকরা ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি, অর্থাৎ ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস বাস্তবে খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

এই খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যেই লবণাক্ততার চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। কয়রায় খাবার পানির ৫৫ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। আশাশুনিতে এই হার ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ কয়রায় খাবার পানির অর্ধেকেরও বেশি উৎস কোনো না কোনোভাবে লবণাক্ততার প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি পান করার ফলে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আগের গবেষণাগুলোতেও পানির লবণাক্ততা ও উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তবে খাবার পানিতে লবণাক্ততার স্বাস্থ্যগত প্রভাব নির্ধারণে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিনেইস বলেন, বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। সোডিয়ামসহ পানিতে থাকা অন্যান্য খনিজ উপাদান মানুষের স্বাস্থ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তার মতে, খাবার পানির স্বাস্থ্যগত মান নির্ধারণে উপযুক্ত নির্দেশিকাও জরুরি।

গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের দিকটিও সামনে এসেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির উৎসে দীর্ঘস্থায়ী লবণাক্ততা তৈরি করতে পারে। তাই দুর্যোগের পর দ্রুত পানির উৎস পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি উপকূলীয় পোল্ডার ও বাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলো আরও উঁচু করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আইসিডিডিআর,বি’র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ নেই। জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবসম্মত অভিযোজন কৌশল ও নতুন সমাধান নিয়ে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে একসঙ্গে বিবেচনা করে কার্যকর সমাধান তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পানি ও স্থানীয় সরকার খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা, উপযুক্ত পানির মানদণ্ড এবং জলবায়ু-সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

গবেষণার ফলাফল বলছে, উপকূলে লবণাক্ততার সংকট এখন আর শুধু পানির স্বাদ বা প্রাপ্যতার সমস্যা নয়। নিরাপদ পানির ঘাটতি যদি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় মানুষের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবাকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আ.দৈ/এসআর





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝